

বিভুরঞ্জন সরকার: অদ্ভুত এক সময় এসেছে মানুষের জীবনে। কতভাবে যে মানুষের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে তা বুঝতেও পারছে না অনেকে। একের পর এক দুর্যোগ আসছে। একটা শেষ না হতেই আর একটা। এক কথায় বলা যায়, মানুষ যেন দৌড়ের ওপর আছে। না, সব মানুষের জন্য হয়তো এটা সত্য নয়। সবাই সংকটে নেই, বিপদে নেই। তবে বেশিরভাগ মানুষের জন্যই বুঝি সুসময় নাগালের বাইরে আছে। সময়কে বাগে এনে একটু স্বস্তি-শান্তিতে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে অনেকের। এই করোনা ভাইরাসের চোখ রাঙানিÑ এটা তো একেবারেই অপ্রত্যাশিতভাবে মানুষকে হতবিহŸল করে দিল। এক দেশে নয়, পৃথিবীজুড়ে। বৈশ্বিক মহামারী। কত মানুষের জীবন গেল। কত মানুষ অসুস্থ হয়ে ভীতসন্ত্রস্ত সময় কাটাল। এখনো করোনার দাপট শেষ হয়নি। টিকা আবিষ্কার হয়েছে, কিন্তু সব দেশে সব মানুষের জন্য এখনো টিকার ব্যবস্থা হয়নি। বৈষম্যের শিকার কত মানুষ। যারা সম্পন্ন, যাদের আছে তারা আরও পাচ্ছে। যাদের নেই, যাদের পাওয়া জরুরি তারা পাচ্ছে না। তেলা মাথায় তেল দেওয়ার রীতি বদলায়নি, বদলানো যায়নি, বদলানোর উদ্যোগও সেভাবে নেই।
করোনায় বাংলাদেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মানুষের আয়-উপার্জনহীন কমেছে। অনেকে কর্মহীন হয়েছে। সরকার অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। তবে সরকারের সামর্থ্যরেও সীমাবদ্ধতা আছে। আবার সরকারি ব্যবস্থাপনাও ত্রæটিমুক্ত নয়। সরকার যা দেয়, যাদের জন্য দেয় তাদের কাছে তা পুরোপুরি পৌঁছায় না। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান স¤প্রতি বলেছেন, সরকারি বরাদ্দের শতকরা ১০ ভাগও উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না। তার পরও দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে দেশের মানুষের এগিয়ে যাওয়া একতালে হচ্ছে না। দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির সুফল কিছু মানুষ অতিমাত্রায় ঘরে তুলছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। তবে তারাও আশা করছে, একদিন তাদেরও সুদিন আসবে। কারণ কথায় আছে, দিন কারও চিরদিন এক রকম যায় না। না, এমন অনির্দিষ্ট আলোচনা না বাড়িয়ে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে। খবরের কাগজে জিনিসপত্রের দাম বাড়ার খবর প্রায় বিরতিহীনভাবেই ছাপা হয়। তার মানে জিনিসপত্রের দাম বাড়া একটি নিয়মিত ঘটনা হয়েছে। কিন্তু মানুষের আয় কিন্তু প্রতিদিন বাড়ে না। আয় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ার কোনো নিয়ম নেই। আয় বাড়ানোর উপায়ও সবাই সমানভাবে রপ্ত করতে পারে না। যারা শ্রমজীবী, যাদের আয় কম এবং নির্দিষ্ট এবং যাদের আয় নিত্যদিন ওঠানামা করে তাদের জন্য মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা কতটা অসহনীয় তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবে না। এখন শীতের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বাজারে শীতের সবজির অভাব নেই। কিন্তু দাম? কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আজ যে ফুলকপির দাম ৩৫ টাকা কাল কিনতে গিয়ে এই দামে পাবেন তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ও সরবরাহ কম থাকলে সাধারণত দাম বাড়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশে দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকে না। কতিপয় মানুষের ইচ্ছার ওপর এটা নির্ভর করে। এখন নতুন ধানের মৌসুম। এবার ফলন খারাপ হয়েছে বলে কোনো খবর শোনা যায়নি। তা হলে চালের বাজার এখন কেন চড়া? কোনো সন্তোষজনক জবাব কেউ দিতে পারবে না। কিছু মানুষ যারা চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদের মনে হয়েছে একটু বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নিতে, তাই দাম বাড়িয়ে দেওয়া। ক্রেতা বা ভোক্তারা অসহায়, তারা অসংগঠিত এবং পরিস্থিতির শিকার। তারা পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেন না। অন্যের তৈরি করা পরিস্থিতিতে খাবি খান।
কয়েকদিন আগ নীলফামারীর একটি খবর ছাপা হয়েছে একটি জাতীয় দৈনিকে। ‘ব্রয়লার মুরগির দাম বেড়েছে’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটি হয়তো অনেক পাঠকের নজরেও পড়েনি। নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থার কারণে রাজধানীর বাইরে কোথাও ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার খবর কারও আলাদা মনোযোগ আকর্ষণ না করারই কথা। ব্রয়লার মুরগির দাম এতদিন একটু কম থাকায় স্বল্প আয়ের মানুষও প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে তা কেনার সাহস করত। তিন দিনের ব্যবধানে প্রতি কেজি ব্রয়লারের দাম ৩০ থেকে ৪০ টাকা বাড়লে নিম্নবিত্ত বা গরিব মানুষের মাংসের স্বাদ নেওয়ার আর সাধ হয় না।
দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর একটি কথা চালু থাকলেও মাংসের স্বাদ আর কম দামের কিসে মেটানো যায়, তা নিয়ে কোনো প্রবাদের কথা শোনা যায় না। কেন ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ল? বলা হচ্ছে বাজারে ব্রয়লারের সরবরাহ কম। মুরগির খাবারের দাম বেড়েছে। বেড়েছে নাকি অন্যান্য খরচও। তাই দাম না বাড়ালে অর্থাৎ ভোক্তাদের পকেট না কাটলে চলবে কেন?
অনেকে রসিকতা করে বলেন, বাঙালির হাত তিনটি। ডান হাত, বাঁ হাতের সঙ্গে আছে ‘অজুহাত’। সবকিছুর পেছনে একটি অজুহাত দাঁড় করাতে আমাদের জুড়ি নেই। জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে ব্যবসায়ী, আড়তদার, মহাজন, ফড়িয়া, ফাটকাবাজ, মধ্যস্বত্বভোগী- সবার কাছেই অজুহাত মজুদ থাকে। আকাশে মেঘ জমলে কিংবা কড়া রোদ উঠলেও পণ্যমূল্য বাড়ানোর অজুহাত তৈরি করা যায়। লোভ এবং লাভ- এ দুটি অনেকের অস্থিমজ্জায় জড়িয়ে আছে।
গুজব ছড়িয়ে বা শঠতার আশ্রয় নিয়ে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে সাধারণ ভোক্তা-ক্রেতাদের গলা কাটা হয় নিয়মিত। যেমন গুজব ছড়ানো হয়েছে, ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানি কমতে পারে! কমেনি, কমতে পারে- এটা বলেই বাড়িয়ে দেওয়া হলো দাম। মুনাফা ঘরে তুলে নেয় মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ, গচ্চা দিতে হলো অসংখ্য মানুষকে।
কোনো জিনিসের দাম একবার বাড়লে আর কমার কথা শোনা যায় না। যারা ব্যবসায়ী বা দোকানদার তারা ইচ্ছেমতো জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে পারেন। কিন্তু কমাতে পারেন না। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। আমরা চলছি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে। সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সরকার সে রকম কিছু চায়ও না। ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদরা এখন একাট্টা হয়েছেন। কে ব্যবসায়ী আর কে রাজনীতিবিদ, বোঝা মুশকিল। পেঁয়াজ এবং চিনির ওপর শুল্ক কমানো হয়েছে। কিন্তু বাজারে তার কোনো প্রভাব নেই। ভোক্তাদের কিনতে হচ্ছে বেশি দামেই। ভোজ্যতেলের দাম বেড়েই চলেছে। চাল-ডাল-তেল-আটা-ময়দা-সাবান-টুথপেস্টসহ কোন জিনিসের দাম বাড়েনি? এর ওপর এখন আছে মাস্ক, সাবান, স্যানিটাইজারের বাড়তি খরচ। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। কিন্তু আয়-রোজগার বাড়ছে না। কী করবে সাধারণ মানুষ?
এই যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে হঠাৎ করে বাংলাদেশেও তেলের দাম বাড়ানো হলো, এর প্রতিক্রিয়া জনজীবনে কতভাবে পড়ছে তা কি নীতিনির্ধারকরা একবারও ভেবে দেখেছেন?
সরকার জ্বালানি তেলের (ডিজেল ও কেরোসিন) দাম বাড়ানোয় চতুর্মুখী চাপে পড়েছেন অসংখ্য মানুষ। এর অভিঘাত পড়েছে করোনা মহামারীতে ‘নতুন দরিদ্র’ তিন কোটি ২৪ লাখ মানুষের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, উৎপাদক, চাকরিজীবীসহ স্বল্পআয়ের মানুষের ওপর।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সড়ক পরিবহনের ভাড়া ২৭ শতাংশ এবং নৌপরিবহনের ভাড়া ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি। দেশে নতুন করে তিন কোটি ২৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়েছে। এই চরম দুর্দিনে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির ফলে দ্রব্যমূল্য আরেক দফা বৃদ্ধিসহ জীবনযাত্রার সর্বক্ষেত্রে ব্যয় বেড়ে যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘তেলের দাম বাড়ার ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাবে। কমবে ভোগ ব্যয়। সংকুচিত হবে অর্থনীতি। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।’
দেশে করোনাকালে তিন কোটি ২৪ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে বলে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) যৌথ জরিপে বলা হয়েছে। গত ছয় মাসে ৭৯ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। করোনাকালে দারিদ্র্যের কারণে ২৮ শতাংশ মানুষ শহর থেকে গ্রামে চলে যায়। তাদের মধ্যে ১০ শতাংশ এখনো শহরে ফিরতে পারেনি। শহর অঞ্চলের মানুষের আয় কোভিড-পূর্ব সময়ের তুলনায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। গ্রামাঞ্চলে এ আয় কমেছে ১২ শতাংশ।
জরিপে দেখা যায়, মানুষের খাদ্যের ক্ষেত্রে ব্যয় কোভিডকালের তুলনায় কমে গেছে। শহরে দরিদ্র মানুষের মাথাপিছু ব্যয় ছিল ৬৫ টাকা। এখন তা ৫৪ টাকা। গ্রামে ব্যয় ছিল ৬০ টাকা, এখন ৫৩ টাকা। শুধু খাদ্যই নয়, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ও যোগাযোগ খাতে দরিদ্র মানুষের ব্যয়ও বেড়েছে। এ বছরের মার্চ মাসে শহরের বস্তিতে এ ব্যয় ছিল ৯৩৬ টাকা। গ্রামে এ-সংক্রান্ত ব্যয় ৬৪৭ টাকা থেকে বেড়ে ৭৭৭ টাকা হয়েছে। বাড়তি এসব ব্যয় মেটাতে গ্রামে ৬২ শতাংশ, শহরে ৬০ শতাংশ মানুষকে ঋণ করতে হয়েছে।
করোনা পরিস্থিতির কারণে ৬২ শতাংশ মানুষ কাজ হারিয়েছে বলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সা¤প্রতিক এক জরিপে উঠে আসে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, আয় কমে যাওয়ায় ৫২ শতাংশ মানুষ খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে কৃষি খাতে ডিজেলের ব্যবহার ১৬ শতাংশ। হঠাৎ খরচ বাড়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। সেচ দেওয়ার যন্ত্রের প্রধান জ্বালানি ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছে লিটারে ১৫ টাকা। এতে এবারের বোরো মৌসুমে কৃষকের সেচ বাবদ বাড়তি খরচ হবে ৭৫৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, বিঘাপ্রতি সেচের জন্য বাড়তি ৩০০ টাকা খরচ জোগানোর পাশাপাশি ধান বিক্রিতে প্রায় ৩ শতাংশ মুনাফা কমবে কৃষকের। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন খরচ বছরে বাড়ছে এক থেকে দুই টাকা করে। সরকারি হিসাবে গত মৌসুমে বোরো ধানের কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ টাকা। অর্থাৎ প্রতিমণ ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয় এক হাজার ৮০ টাকা। এবার সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাড়তি চাপ তৈরি করবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর বহুমুখী প্রভাব পড়ে। গণপরিবহন, কৃষি উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। এই সুযোগে অনেকে বাড়িভাড়া এমনকি রিকশাভাড়াও বাড়িয়ে দেবে। গত কয়েক মাসে আমরা খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী দেখছিলাম। এখন সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। একই সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার অবক্ষয় (বেশি টাকায় কম পণ্য) হবে। একদিকে কম আয়, অন্যদিকে ব্যয় বেশি হওয়ার ফলে জীবনযাত্রার ওপর প্রচÐ চাপ পড়বে।’
দেশের অধিকাংশ মানুষ যদি জীবন-জীবিকা নিয়ে প্রচÐ চাপের মধ্যে থাকেন তা হলে মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধির গল্প কি স্বস্তির কারণ হতে পারে?
লেখক : সাংবাদিক।শেয়ার করুন।