

দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অনিয়ম ও প্রশাসনিক বিতর্কের পটভূমিতে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমসে বড় ধরনের রদবদল এনেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনসহ কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের মোট ১৭ জন কমিশনারকে একযোগে বদলি করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) এনবিআরের কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনের দ্বিতীয় সচিব মোহাম্মদ আবুল মনসুর স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বেনাপোল কাস্টমসের বিদায়ী কমিশনার খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুবিভাগের মহাপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। তার স্থলে বেনাপোল কাস্টমস কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মো. ফাইজুর রহমান, যিনি এর আগে রাজশাহী কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সূত্র জানায়, বেনাপোল কাস্টমসে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্য বন্ধে উদ্যোগ নিতে চার মাস আগে খালেদ মোহাম্মদ আবু হোসেনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বহিরাগত নিয়ন্ত্রণ, কিছু ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা জোরদার এবং ঘুষ বাণিজ্য ঠেকাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তবে ব্যবসায়ী ও সেবাগ্রহীতাদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে তেমন দেখা যায়নি।
বরং তার দায়িত্বকালেই একাধিক ঘটনায় বেনাপোল কাস্টমস নতুন করে সমালোচনার মুখে পড়ে। গত ৭ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বেনাপোল কাস্টমস হাউসে অভিযান চালিয়ে এক রাজস্ব কর্মকর্তার কাছ থেকে ঘুষের টাকা উদ্ধার করে এবং তার সহযোগীকে আটক করে। অভিযোগ রয়েছে, অভিযানের সময় অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে ছেড়ে দিতে চাপ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বিক্ষোভের মুখে পরদিন ওই কর্মকর্তাকে পুনরায় দুদকের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এছাড়া ভারত থেকে আসা কাগজপত্রবিহীন পণ্যবোঝাই ট্রাক আটকের ঘটনায়ও অপরাধীদের রক্ষার অভিযোগ ওঠে কমিশনারের বিরুদ্ধে। এসব ঘটনায় বেনাপোল কাস্টমসের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, কমিশনার নিজে কিংবা তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও সেগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়নি। অভিযোগ যাচাই বা অভ্যন্তরীণ তদন্তের পরিবর্তে এসব প্রতিবেদন উপেক্ষা করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। এমনকি অনিয়ম নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলেছিলেন এমন ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্টদের শোকজ করার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা কাস্টমস হাউসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে।
এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক ও অনলাইন গণমাধ্যমে ফাইল আটকে রেখে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ প্রকাশিত হলেও সেসব বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে কাস্টমস হাউসে ফাইলকেন্দ্রিক অনিয়ম আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন তারা।
একইসঙ্গে বেনাপোলের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন কাস্টমস ও ভ্যাট দপ্তরেও এই রদবদল কার্যকর হয়েছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এনবিআর ঢাকার কমিশনার আবুল বাসার মো. শফিকুর রহমানকে চট্টগ্রাম আইসিডি কাস্টম হাউসে, যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার শেখ আবু ফয়সল মো. মুরাদকে চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটে এবং এনবিআরের মহাপরিচালক মো. আবদুল হাকিমকে যশোর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে।
এছাড়া গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রংপুরসহ বিভিন্ন ভ্যাট কমিশনারেট এবং সাতক্ষীরার ভোমরা ও খুলনার কাস্টমস দপ্তরেও নতুন পদায়ন দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই একযোগে বদলি কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি ফেরাতে এনবিআরের একটি স্পষ্ট বার্তা। বিশেষ করে দেশের প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টমসে নতুন কমিশনারের নেতৃত্বে বাস্তবে কী পরিবর্তন আসে, সেটিই এখন সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে।