মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১০:৩৯ অপরাহ্ন

কবি বিদ্যুৎ ভৌমিকের একগুচ্ছ নির্বাচিত কবিতা

কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক
  • খবর আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৪
  • ১৫৬ এই পর্যন্ত দেখেছেন

সেই মেয়েটার মৃত্যুর গল্প

ভুল স্বীকারের গুপ্ত ভয়ে
পাঁচ পা পিছিয়ে যেতেই নিজের জন্য তুচ্ছ হয় গোটা জীবনের সঞ্চয় !
নানা আয়োজনে ভেতরটুকু বহুবার ঢেকেছেন কৃতকৌশলে একান্ত নিজেকে ; অতলান্তে অশান্ত আত্মবীজ ঈশ্বরীও স্তব গানে লক্ষজনের ভেতরও একা ও একক হয়ে মিথ্যা মিথ্যা নিছক হেয়ালীতে হাসে ও দাপটে কথা বলেন ! তবু অতন্দ্র চেষ্টা তাঁর প্রতিদিনের রাত ঘুমে সিংহাসন লোভা স্বপ্নে বহতা বিভোর !

এই এক মাসের ভেতর ধর্ষিত মেয়েটার খুন হবার খবর পেয়ে গেছে দেশ দেশান্তর , রাতের অন্ধকারে পথে পথে মোম শিখার আলোয় এক আকাশ আবেগে বিচার চেয়ে চলেছে কত শত হাজার – লক্ষ প্রতিবাদী মুখের দল !
ওদের রক্তাক্ষরে লেখা পোষ্টার গুলো নৈঃশব্দের ভেতর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে সারা রাতের লাইভ টেলিকাস্টে !

সেদিন অন্য কিছু অচল নিভৃত দশায় চাঁদ ছিল অলৌকিক নির্বাসনে ; তুমি ছিলে প্রতিরাতের মত শান্ত নিরবে একক ……..

রাস্তার আনাচে কানাচে খুন হয়ে যাওয়া অসহায় প্রেত ছায়াগুলো চোখে ভর রেখে নিঃশব্দে পা ফেলে ফেলে হেঁটে গেছে লাশকাটা ঘরের দরজার কাছে ! তোমাকে শেষবারের মত দেখতে ,……

শেষ একবার অন্য দিনের মত ওই দিন ঘুমন্ত ছিলে তুমি ; পরবর্ত্তী অথৈ প্রহরে নষ্ট সময়ের বাতাবরনে সহজ সত্য ভাবে ঘুম থেকে উঠে হাত ঘড়িতে সময় দেখনি সেদিন !

সেই কুটিল ক্ষণ প্রবাহে চাঁদ – তারা – আকাশের মতই বাতাসও স্তদ্ধ ছিল নিঃশব্দ অবিরাম ,….. অপৌরুষ কুলাঙ্গার রূপী কুৎসিত্ লোলুপ থাবা গুলো ঘৃণ্য নখড়ে তোমার পবিত্র নারীত্বের আদোলকে করে ছিল ক্ষত বিক্ষত , ….. তোমার অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর বুক ফাঁটা আর্তনাদের ভাষাহীন স্তবক বন্ধ ঘরের চার দেওয়ালের দরজা ভেঙে সভ্যতার কর্ণ কুঠরিতে তখনো এসে ঘুম ভাঙায়নি উঁচু আকাশের মহামান্য তারাদের ! সময় ধরে ধরে তুমি একটু একটু করে তখন মরে যাচ্ছিলে , …..

তোমার করুণ আর্তনাদের ভেতর দয়া মায়াহীন ভদ্র সেজে থাকা ছদ্মবেশী পাষন্ড শয়তান গুলো আদীম হিংস্র অসভ্যতায় এক এক করে ছিড়ে খাচ্ছিল তোমার নিঃষ্কলঙ্ক শরীর ; একে একে বহুরূপ উত্তেজনায় গর্ভগৃহে ঢেলে দিয়ে ছিল বিষাক্ত যৌন হলাহল !

হে প্রাণ প্রতিমা ক্ষণজন্মা মাতৃ রূপিনী বিশ্ব জননী নারী ; তোমার বিদায় ক্ষণে বিসর্জনের ঢাক মৃদু কান্নায় আচম্বিতে বেজে উঠলো আশ্বিনের শারদ প্রাতে শিশির ভেজা শুভ্র সকালে !

___________________________________

অস্বীকার তো করিনি তোকে

একটা ছায়ার উপর দাঁড়িয়ে মনে হল যেন আমিও কৃয়াপদহীন ; অশরীরী ! কবেকার মনটুকু জটিল সময়ের ভেতর দিয়ে থেকে থেকে ভুলে গেছে নিজেকে নিজেই ,—– এই মন দেহশূন্য নামগোত্রহীন অপ্রমেয় বিদেহী !

তুই অস্বীকার করলেও , না করলেও আমি প্রাচীন ভাষ্কর্যের মত এভাবেই একা ও একক রোদ বৃষ্টিতে নিঃসঙ্গ ! মন খারাপের গন্ধে নির্ঘুমে একাই থেকেছি স্মৃতিবাস সম্মেলিত ; এই নৈমিত্তিক কারণে তোকে ছুঁয়ে দেখার সামর্থ্য হয় নি একবারও ….. তবুও এই প্রেমগুলোতে তুই-ই যেন কুয়াশা মেখে অস্পষ্ট ভাসমান এখন !

কবিতার পাতায় পাতায় বুদ্ধিদীপ্তা সুন্দরি তুই , এটা যেন আমার নিঃশব্দে বলে ফেলা কাঙালপনা ; তাই না রে ?
সেবার হঠাৎ বৃষ্টিতে বুকে জ্বলছিল অহংকার ; অন্য এক স্বপ্নের কাছে তুই ও পলাশ রঙা হাসি ছড়িয়ে বিক্রি করছিলি তোর আনন্দ – সুখ ; আরও কত কি ! আমি তখন কতকালের শ্মশানে একা এভাবেই পুড়ছিলাম ; সেই দেখে দেখে !

এই একটাই দেওয়ালহীন ঘর ; আশ্চর্য রকম বৈরাগ্যে অনেকটাই রূপকথার মত ! এখানে এই ঘরে তোর শ্বাস – প্রশ্বাস একদিন ছিল ভীষণ অলিখিত সর্তহীন ….. অথচ এখন এই ঘরটা নেটওয়ার্ক ছাড়া বেমালুম নিরবতায় আহত বিষাদাকীর্ণ তুইহীন নিঃশব্দ ; নির্জন !

কিছু কিছু নির্জনতা নির্ধারিত স্তব্ধ ; একেবাকেই কথাহীন ৷ নতুবা প্রেমের কাছে অনেকটাই অহর্নিশ কৃতদাশ ! অন্তর্দহনে দগ্ধে দগ্ধে না মরেও মৃত চিরকাল ,—- যদিও কবিতার কাছে কতবার তোর জন্যে ক্ষমাও চেয়েছি হৃদয় শূন্য করে ; কতবার এই ঘরের বিছানা চাদর পুড়েছে অমনষ্কে সিগারেটের আগুনে , একমাত্র তোকে মনে করে ! স্নায়ুতে মায়াবন্ধনী তুই ; এই অবধারিত মন কষ্ট এক মূহুর্ত বিশ্রাম দেয়নি আমাকে ….. অথচ বহু দূর থেকে একই পথ ধরে চলতে চলতে গাছবৃষ্টি চোখের পাতা ভিজিয়ে ছিল ; সেটা একমাত্র তোরই জন্য হে প্রেম !

মৃত্যু মৃত্যু স্বপ্নগুলো জীবন্ত ফসিল ; এই প্রবাহমান সৃজন কষ্ট গুলো ইচ্ছানুযায়ী মরে ও বাঁচে এটা একমাত্র তোরই জন্য হে প্রেম , প্রিয় নারী ! অশরীর ভালোবাসা !!
_______________________________________

স্তবকে নির্ঘুম আদরের ওষ্ঠ

এই নিঃশব্দ প্রবাহে ঝিঁ ঝিঁ আঁধার মেশা বৃষ্টির ভেতর প্রিয় পুরুষ অচম্বিতে তোকে ছুঁলেই ; কপাল জুড়ে ঘাম ঝরাচ্ছে মহত্ প্রেমার্ত ! তবু শেষ আদরটুকু মৃত্যু দিয়ে সোদ কী হবে তায় , ….. বুকের ভেতর মন হারানোর কথা ; সাত সমুদ্রে কত দূরে ভেসে যায় ! সেই বয়সটা মেঘলা রঙ নিয়ে এভাবেই আঁকে ছবি ; সেই ছবিতে নেইযে অসুখ – বিসুখ , …. তবুও তুমি একাই একক নারী ; প্রেম-অপ্রেমে অদেখা অনেক কিছু ! বৃষ্টির গন্ধ মেখে এভাবেই নির্ঘূম রাত্রি যাপন ……..

অনেকটা পথ একটানা চলে চলে ; মন হারানোর পদ্য বলি তোকে ,
অনেকটা রাত বৃষ্টির ধ্বনী শুনতে শুনতে জেগে বসে শেষকালে , এ’মন শুধু ডুবেছে গভীর শোকে ! অন্য পুরুষ আমার মতন করে হঠাৎ তোকে স্বপ্নে চুমু খেলে ; লজ্জায় তুই শেষ করে দিশ অন্য আরও কিছু কথা , ….. তোর অভিমানে অন্য নারীর চোখে তাকিয়ে দেখি ভাঙাচোরা নীরবতা !

এই যে আমার অতীত হয়েছে শুরু ,
চোখের পাতায় ভাসছে মৃদু বর্ষণর অতলান্ত অভিমান ; ওই যে আমার কত কবিতার বাণী চিরন্তনী অথচ এলোমেলো ! না পাওয়ার জ্বালায় পুড়ছে বহুকাল ……..

যদিও এই একটানা বৃষ্টিতে প্রেম-ট্রেম বোঝেনা রাত ; মন যেন ভেজা ভেজা বাতাসের সাথে অন্য কথা বলে ,….
মেঘের বুকে কাপুরুষ তারাগুলো মান-অভিমানে এভাবেই পথ চলে ! ঠিক আমারি মতন …..

আমিও ভাবিনি শেষ স্তবকের মত গোপন করি অদেখা পুরুষটাকে ;
সাদাপৃষ্ঠায় বর্ণিত করি তোর ভিজে ওঠা নগ্নতা ,
মৃদু হাসি হেসে নীরবতা নিয়ে থাকে আজীবনের কলঙ্ক ও পাপ !

তবুও কেন রাতভোর বৃষ্টিতে অপেক্ষায় বসে থাকে দেওয়ালে আমার সাতান্ন বছরের ছায়া ; চুপ হয়ে যাই শরীর থেকে নিজে , …..
নিপুণ ভাগ্যে চিতার আগুনে জ্বলি , দর্পণে দেখি দু’চোখ অজান্তেই উঠেছে ভিজে !

___________________________________
এবং নির্বাসন

শেষটুকু শব্দশ্বাস ফেলে তবেই শরীর ছেড়ে আমার আত্মগোপন ; এহেন এক্ষণে জোনাক প্রহর ! সমস্ত সস্তা বৈভব , কিছু কিছু উল্টো সময়ের বিমূর্ত ধ্বনী ; জরুরী মনে করে ফেলে আসা সন্ধ্যার ওই রাস্তাতে রাতটাকে কাছে টেনে নিতে ,—– অশরীর এভাবে !

এই ঘরে আমার তেইশটা বছর ; একই নিঃসঙ্গ যাপন …. তবুও সহজ সত্য নিরবতায় প্রাচীন দর্পণ থেকে অবশেষ নিঃশব্দে আমার ইচ্ছাকৃত নির্বাসন !

দু’চোখে ডুবে আছে যাবতীয় স্বপ্নের স্মৃতি ; মৃত্যুর প্রত্যন্ত গভীরে চেনা মুখগুলো এই নীরবতামাখা দেহটাকে কতযে আবেগ শৈলী দিতে চারপাশ ছেঁয়ে ফেলে !
বহু কালের কথার চেহারা গুলো এভাবেই দীর্ঘশ্বাস ছড়িয়ে দেয় ফুল-চন্দন বৃত আমার শরীরে ,——

সব সত্য এভাবেই মেনে নিতে নিতে ভোরের আজানে আমি শ্মশানে জ্বলি বহতী নীরবতায় !
যদিও আত্মঘাতী কিছু স্মৃতি ; যাদের জন্য আমি মৃত্যুর পরবর্তী সময়েও সতত যন্ত্রণা নিয়ে মৃত্যুর ভেতর থেকে চড়ম অস্থিরতায় নতুন করে বেঁচে উঠি !

এভাবেই শরীরহীন অদ্ভুত শিহরণ ওঠে অপছন্দের কিছু ছদ্ম আদর্শ দেখে ; নিজের জ্বলে ওঠা শরীরের উপর বসে স্বপ্নে ভাসা দূরে মিলিয়ে যাওয়া অতীত গুলোকে নিঃশব্দ মাখা মৌন চিৎকারে বলি ; বিদায় বন্ধু , শেষ হোক প্রাণহীন অন্তরে যাবতীয় স্তব্ধতা ! দূরে ব-হু দূ–রে আয়নার তেপান্তর ; অথবা স্মৃতিশূন্য হোক আমার নির্নিমেষ নির্বাসন ! !

______________________________________
মৃত্যু ধ্বনি ও বিদেহী অনুভূতি

মন থেকে কবেই হারিয়েছে কবিতার লুকানো বয়স ! যদি সময় চিনে চিনে দু’চোখে মৃত্যুর অসুখ মাখি ; তবে কী আরোপিত চিন্তায় দরকার মতো ডুব দেবে অবিকল ফেলে আসা আঠাশটা বছরের জন্মঋণ ? এই ভাবে দহনে বিমূঢ় কষ্টে স্মৃতিরা কাঁদে ! একই ভাবে রাত নিয়ে প্রতি পদে অতলান্তে পঙ্গু হয়ে অনেকটা চলা ,—— একই পথে শহরতলির রোদ ও বৃষ্টি ; অবগাহনে চোখ স্তব্ধ এতকালের কবিতাগুলোর কঠিনতম নীরবতা ! সেই’- যে অসংখবার মৃত্যুর একই পথে আমিহীন অন্য পৃথিবী ; অলৌকিক নগ্ন সাহসী ! এভাবেই ছায়াময় ঝাপসা স্মৃতির মধ্যে আমার ঘোরাফেরা থেমে যাওয়া সেই বয়সে !!

শূন্যের মধ্যে নেপথ্যে আয়নায় আঁকি মৃত্যু ছবি ! শ্মশান থেকে চলে আসার পর অদূরে গভীরতা ভরা নীরবতা ; নৈঃশব্দ্যে নিবিড় , তবুও এই পথে চোখের স্তব আমার প্রতিটা মৃত্যুর আশ্চর্য হেয়ালী নিয়ে মেতে থাকে ! একি আমি ; যতটা বিমূর্ত ততোটাই নিঃশ্চুপ উলঙ্গ !
আত্মার নিরাকার ব্যাথার দাগ গুলো থেকে গেছে একটাই মনে ; বদলেছে সময় অসময়ে শরীর , রক্ত , শিরা – উপশিরা ! তবুও মৃত্যুর ইচ্ছা নিয়ে মরি মরণের বহু আগে !

একই কথা বারেবারে বুকের প্রশ্বাসে ফিরে ফিরে আসে ; কার্যত ভিন্ন ভিন্ন আকৃতি নিয়ে যৌন দরজা দিয়ে পৃথিবীতে প্রবেশ ! এভাবেই জন্মের বহু আগে মৃত্যুর বীজ বপন ; কিছুই সত্য নয় ! আমি হীন আমিতেই পরে থাকা একান্নভাগ গোপনতা নিয়ে !
এই মৃত্যু গুলো প্রতিবার শূন্য দিয়ে মন পোড়ায় , প্রতিবার সমৃতিকে সান্ত্বনা দেয় আমার বিদেহী প্রেত ! নতুন করে ঘরে ফেরার দুঃস্বপ্ন জ্বলে ওঠে দূরবর্ত্তী শ্মশানে ! সেখানে চিতার আগুনে রচিত হচ্ছিল আমার আগামী জন্মের দিনক্ষণ ! এরপর ; সবটাই বিস্মৃতির অবিশ্বাসে ঢাকা সময় ও সভ্যতা !!

__________________________________

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102