বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ডেঙ্গু-চিকনগুনিয়া প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও র‍্যালী অনুষ্ঠিত তেতুলিয়া ইউএনও এর বিরুদ্ধে ১৫ শতাংশ ঘুষ আদায়ের অভিযোগ কালুরঘাট সেতুর কাজ দ্রুত বাস্তবায়‌নে স্মারকলিপি প্রদান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য রিয়েলমির বিশেষ আয়োজন ‘ঈদের হাসি’ ল্যান্সনায়েক শহীদ গৌছ আলী মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদৌগে ঈদ উপহার বিতরণ অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে জমি দখলের চেষ্টায় অভিযোগ স্বাধীনতার মাসে যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোক প্রস্তাবে সংসদ কলুষিত বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে স্বাধীন দেশ পেতাম না —ড.একে আব্দুল মোমেন ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পালিত লায়ন্স ক্লাব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট এর উদ্যোগে ইফতার সামগ্রী ও ঈদ উপহার বিতরণ অনুষ্ঠিত

একটি স্কুল ও মুক্তিযোদ্ধ

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : সোমবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৭১০ এই পর্যন্ত দেখেছেন

শামস উদ্দীন আহমদঃ বিষয়টি নিয়ে সুন্দর একটা মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক উপন্যাস লিখব মনে করেছিলাম। সযত্নে লালন করছি এর কাহিনী, চরিত্র, এর সময়কে। ঘাত-প্রতিঘাত, দ্বন্দ্ব সংশয়, সবকিছুকে। এ সময়ের সমগ্রতাকে আমি তুলে ধরবো- মনে মনে এই ছবি আঁকছি। কিন্তু বাধ সাধলো একটি ছোটগল্প। একটি ছোটগল্প আমার এখুনি লেখা চাই…. গল্পের মতো সত্য, না সত্যের মতো গল্প পাঠকই বুঝবেন।

তখন মুক্তিযুদ্ধ নয়- উত্তাল গণ আন্দোলনের প্রভাত সময়। লালিমা পূর্ব দিগন্তে। আমাদের থানার সার্কেল অফিসার (সি,ও ডেভ) লোক পাঠিয়ে আমাকে খবর দিয়েছেন দেখা করতে। আমি তখন এক ডিগ্রি কলেজে পড়ি। ছুটি পেলেই বাড়ি। গ্রামের কাজ, এলাকার কাজ। দেখা করতে গেলাম। সালাম দিয়ে কামরায় ঢুকলাম । সিও সাহেবের নাম মনে আছে, বলা নিষ্প্রয়োজন। বয়োজ্যেষ্ঠ, স্নেহশীল। আমাকে যত্ন সহকারে বসিয়ে চা খাইয়ে বললেন, আবদুর রহমান, তোমার এলাকায় আমি এবার পর পর তিনদিন গেলাম। একটা উচ্চ বিদ্যালয় নেই । ওখানে একটা স্কুল স্থাপন করতে চাই আমি। আমি পারি না, একমাত্র তুমিই পার। সবাই তোমার কথা বলে। আমি অবাক হয়ে বললাম, আমার কথা?

হ্যা, তোমার কথা। তুমি ইচ্ছা করলেই একটা হাইস্কুল হয়ে যায়।আমি সবিনয়ে বললাম, আমি একজন ছাত্র মানুষ, আমি কীভাবে স্কুল দেবো? সিও সাহেব হেসে বললেন, তুমি জান না বাপ, আমি জানি, তুমি পারবে। মানুষ তোমাকে কত ভালোবাসে সে আমি ভালো করে জানি। তুমি চাইলেই একটা স্কুল হয়ে যাবে।

আমার কাছে কথাগুলো ধাঁধার মতো লাগে। প্রায় মরিয়া হয়ে বললাম, কিন্তু কীভাবে সম্ভব? তিনি বললেন, ডিষ্ট্রিক্ট কাউন্সিলের রাস্তার পশ্চিম পাশেই তোমাদের গ্রামের বেশ কিছু উঁচু জমি আছে, তুমি চাইলেই ঐ জমিতে সুন্দর একটা স্কুল হয়ে যায়। তুমি আমাকে ঐ জমিটা দাও। – জমি তো আমার না। আমার বাবার কিছু আছে। বাকী অন্যান্য মালিকের। – তুমি আমাকে জমি দাও। আমি তোমাকে একটা ভালো চাকুরী দেব।

আমি একটু বিস্ময়ের সঙ্গে বললাম, আমি চাকরি করব, একথা আপনাকে কে বলেছে? এখনও বি.এসসি শেষ করতে পারি নাই। আমি তো আপনার কাছে চাকরি চাইনি? কথাগুলো আমার একটু কঠিন স্বরে বের হয়ে গিয়েছিল বলে মনে হয়। সি,ও সাহেব একটু অপ্রস্তুতের মতো হয়ে বললেন, না, না, আবদুর রহমান, আমি তোমাকে কোনো লাভে দেখাবার জন্যে বলিনি, স্নেহবশতঃ বলেছি। তোমার ইচ্ছে হলে চাকরি করবে। আমাকে তুমি জমিটা দাও। নিরুপায়ের মতো হেসে আবার কাতরকণ্ঠে বললাম, আমার বাবার জমি বিঘাখানেক আছে। উনার পায়ে ধরে, হয়ত, আনতে পারব। এক বিঘায় হবে?
-‘অন্ততঃ সাড়ে তিন বিঘা হলে চলে। তুমি তোমার গ্রামের মানুষকে বললে হয়ে যাবে। আমি বলছি, তুমি যাও। ব্যর্থ হবে না তুমি।’
‘চেষ্টা করব’ বলে সালাম দিয়ে চলে এলাম। স্কুলের কথাটা সংক্ষেপে শেষ করছি।

পরের দিনই শুক্রবার। মসজিদে গ্রামের মাতব্বরবৃন্দসহ অনেক মানুষ। আমি এক ফাঁকে দাঁড়িয়ে অনুমতি নিয়ে আমার আবদারটা পেশ করলাম এভাবে, আসসালামু আলাইকুম । সিও সাহেব আমাকে শহরে ডেকে নিয়ে হাইস্কুলের জন্যে পশ্চিমের বড় রাস্তার উঁচু জমি থেকে তিন কেয়ার জমি চাইলেন। আর কোথাও উপযুক্ত জমি পান না। আমাকে বললেন, তুমি ধরলে গ্রামের মানুষ দিয়ে দেবে। আমি আপনাদের মায়া মমতার উপর ভরসা রেখে কথা দিয়ে এসেছি। এখন আপনাদের দয়া।

মসজিদে তুমুল হট্টগোল গণ্ডগোল শুরু হয়ে গেল। মানুষ পক্ষে-বিপক্ষে যার যার অভিমত ব্যক্ত করে উপাসনালয়ের পবিত্রতা ও পরিবেশ বিপন্ন করে তুলছে। কেউ কারো কথা শোনে না।

অবশেষে গ্রামের প্রধান মাতব্বরদের একজন দাঁড়িয়ে বিশৃঙ্খল পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণে আনলেন। কারো কোনো কথা থাকলে দাঁড়িয়ে এক কথায় বলবার জন্যে আহ্বান জানালেন। কয়েকজন দাঁড়িয়ে পক্ষে বিপক্ষে মতামত দিলেন-
(১) জায়গাজমি নিলে কিন্তু হালি চারা পাওয়া যায় না।
(২) জমি নিলে অন্য কোথাও হালি চারা দিতে হবে। টাকা দিলে হবে না।
(৩) গ্রামবাসী টাকা দিবে; অন্য কোথাও জমি কিনে স্কুল হোক।
(৪) সে গ্রামের সকলের প্রিয় ও স্নেহের ধন, মায়ার মানুষ। সে যখন গ্রামের ওপর বিশ্বাস রেখে কথা দিয়ে এসেছে; জমি দান করা হোক। – আর কোন কথা আছে ?

  • না, আর কোন কথা নাই। আছে ? থাকলে কও, শেষে কানাঘুষা না । সবাই চুপ। এখন মুরুব্বিদের পালা। প্রধান মুরুব্বী সাহেবকে সবাই অনুরোধ করলে তিনি অবশেষে কিছু সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত দিলেন: আব্দুর রহমানকে গ্রামের সক্কলেই ভালোবাসে। সে যখন আমাদের ওপর বিশ্বাস রাখিয়া কথা দিয়াই আইছে, সারা গ্রামের জন্যে এই জমি এক টুকরা কিছুই না। তারও দাম থাকলো, আমাদেরও নাম হইল । জমির দাম গ্রামবাসী দিব। রাজি থাকলে সবাই আলহামদুলিল্লাহ কও। মসজিদ প্রকম্পিত করে আওয়াজ উঠলো, আলহামদুলিল্লাহ। আমার চোখে পানি এলো দরদর করে।

আমার আব্বা বললেন, জমির মূল্য আমাকে দেওয়া লাগবে না। হাততালি দিতে নিষেধ এলো, এইটা মসজিদ।। এলাকার নামেই হাইস্কুল স্থাপিত হলো। আমরা মাটি কাটলাম, বাঁশ বইলাম । আমি মাঝে মাঝে ছুটিতে টাকাপয়সা ছাড়াই ইংরেজি, অংক, বিজ্ঞান পড়াই।। এলো দুঃসময়। বি.এসসি পরীক্ষা খারাপ হয়েছে। নির্ঘাত ফেল মারবার ভয়ে ও লজ্জায় বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নিয়ে নিরুদ্দেশ যাত্রা করলাম ।। সিলেটের শহরতলীর এক গ্রামে লজিং থাকি, ছাত্র পড়াই, খাই আর লেখালেখি করি। আমি নিখোঁজ। নিশ্চয়ই আম্মা প্রতিদিন কাঁদেন।

উনিশশো সত্তর সাল যায়। যাক, দেখি আবার পরীক্ষা দিয়ে মুখ দেখাতে পারি কি-না। না, হলো না। যতই দিন যাচ্ছে অনিশ্চয়তা আর উত্তেজনা বাড়ছে একাত্তরের শুরু থেকেই। নির্বাচন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতা দিতে পশ্চিম পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর টালবাহানা দিনে দিনে স্পষ্ট হতে থাকলেও বাংলার মানুষ আশা ছাড়ছে না।

অবশেষে এলো মার্চ। দিনে দিনে বাংলার মানুষ বিদ্রোহ পোষণ করতে থাকলো। এলো সেই অমর ভাষণ। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বজ্র নির্ঘোষে বাংলার মানুষ জেগে উঠলো, পেলো ঐতিহাসিক দিক নির্দেশনা। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

প্রকাশ্য আলোচনার অভিনয় আর গোপনে বাংলাকে ছারখার করবার কুৎসিত ষড়যন্ত্রে এহিয়া-ভুট্টো মেতে উঠলেন। এলো ২৫ মার্চের কালরাত। বাংলার মানুষ ইতিহাসের জঘন্যতম চরম হৃদয়বিদারক হামলার শিকার হলো পশ্চিমা মনুষ্যরূপী হায়েনাদের। দেশ জুড়েই কার্ফু।

২৫ কি, ২৬ মার্চ রাত। যে ঘরে থাকি, শুনি, ঘরের চারিদিকে বুটের শব্দ। এক্ষুণি বলবে দরজা খুলতে। দিনের বেলা নদীর এপার থেকে ওপারে গোসলরত গ্রাম্যবধুকে গুলি করে মেরে হাত সোজা করেছে এসব বর্বরেরা। আল্লাহর নাম নিতে নিতে বড় তসবী পড়তে পড়তে সে রাতে বেঁচে যাই। দিনরাত বন্দী। কোথাও পালাবার জায়গা নেই। দিনরাত কার্ফু। রাস্তাটা দৌড়ে পার হতে গিয়েও কতজন প্রাণ হারিয়েছে, কোথায় যাব। শুনলাম নিজ কানে, কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়ার বক্তব্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। আমরা আশান্বিত হলাম, এইবার মনের মতো কাজ হয়েছে। মুক্তিপাগল বাঙালি ঝাপিয়ে পড়লো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে।

প্রিয় পাঠক, আমাকে ক্ষমা করবেন এসব জানা কথা বলবার জন্য। এসব না বলে আমার দুঃখের কথায় যেতে পারছি না।

আমার জন্য প্রায় পাগল হয়ে যাওয়া মায়ের চেষ্টায় আমার হদিস পেয়ে আমার একমাত্র মামা প্রাণের মায়া ত্যাগ করে পঞ্চাশ মাইল হেঁটে কার্ফুর মধ্যে আমাকে খুঁজে বের করেন। কালবিলম্ব না করে আমরা কার্ফুর মধ্যে কীভাবে বড় রাস্তা পার হয়ে ওপারের গ্রামের ঝোপঝাড়ে ঢুকতে পারি সেই চেষ্টায় রত হই। রাস্তার সন্নিকটে ঝোপের মধ্যে আমরা হানাদার বাহিনীর যাতায়াত লক্ষ্য করে প্রাণ হাতে নিয়ে এক সময় রাস্তা পার হই। দৌড় দেই নাই, দূর থেকে দেখেও গুলি করতে পারে । একরাত দু’দিনে বাড়ি পৌছাই।

সারা গাঁয়ের মানুষ আমাকে এসে দেখে আর বসে বসে কথা শোনে। হানাদার বাহিনী এসব এলাকায় আসেনি। শেরপুর মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ চলছে-দূর থেকে দেখে এসেছি। আমার বিশ্বাস, তারা হটে যাবে, পরাজিত হয়ে বন্দী হবে । দেশের জাগ্রত জনতা এদের পরাভূত করে উপযুক্ত শাস্তি দেবে। আমাদের আওয়ামী লীগ সমর্থক বন্ধুবান্ধবেরা ও এলাকার হিন্দু-মুসলিম বড় ভাইয়েরা সবাই মিলে সন্ধ্যা থেকে আমাদের পুরাণ বাড়িতে আমার কিনে আনা দুব্যাণ্ডের সনি ট্রানজিষ্টার রেডিওর চারিদিকে ভিড় জমাতাম। আমরা শুনতাম আকাশবাণী কলকাতা। দেবদুলাল বন্দোপাধ্যায়ের দরাজ গলার সংবাদ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত সংবাদ বুলেটিন, দেশাত্মবোধক গান, আর এম. আর আখতার মুকুলের ‘চরমপত্র’। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি যখন বাজত আমাদের অনেকের চোখের পানি লণ্ঠনের আলোয় চিকচিক করতো। অনেকক্ষণ কারো মুখে কোন কথা থাকতো না। আর ‘চরমপত্রে’ যখন পাক সেনা বধের কথা শুনতাম, হর্ষধ্বণিতে লাফিয়ে উঠতাম।

ইতোমধ্যে রেডিওর মাধ্যমে নির্দেশিত হয়ে আমাদের এলাকায় সংগ্রাম কমিটি হলো। স্থানীয় আওয়ামী লীগের হিন্দু-মুসলিম নেতৃবৃন্দ অনেক কাজ করবার ব্যাপার আছে বলে উৎসাহী যুবক হিসেবে আমাকে সভাপতির দায়িত্ব দিলেন। নেতৃবৃন্দের পরামর্শে আমি মুসলিমলীগ পন্থি চেয়ারম্যানকে খবর দিয়ে এনে ইউনিয়ন অফিসের দায়িত্ব বুঝে নিলাম। যে লোক গাড়ী ছাড়া চলেন না, তিনি তিন মাইল পায়ে হেঁটে এসে বড় চাবির গোছাটি আমার হাতে দিয়েছিলেন গম্ভীরভাবে। এখন থেকে ইউনিয়ন অফিসই সংগ্রাম কমিটির অফিস। দেখা দিল ডিজেল কেরোসিন তেলের সংকট। আমার নেতৃত্বে প্রতি বিকেলে অফিসের সামনে তরুণ কর্মীরা মানুষের মধ্যে কেরোসিন তেল বিলি করত। পাক সেনা এদিকে আসতে পারে কি না সে বিষয়ে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক খবরাখবর নিয়েই আমরা দিনরাত মত্ত থাকতাম।

আজীবন আওয়ামী লীগ সমর্থক আমার এক বড় ভাই ও তিন চারজন হিন্দু দাদা ছিলেন আমাদের বিচক্ষণ নেতা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তাদের উৎসাহ, স্নেহ ও প্রশংসা আমাকে উৎফুল্ল ও উদ্দীপ্ত রেখেছে। ভারতে পাড়ি দেওয়ার কথা আমরা চিন্তাও করিনি। পরে একদিন শুনলাম, বাজারের বয়স্ক এক হিন্দু ব্যবসায়ী ভদ্রলোক, যিনি এক সময় হাইস্কুলের সেক্রেটারী ছিলেন, তিনি ভারতে গেছেন। মিলিটারীদের আমাদের এলাকায় আসবার সম্ভাবনা খুব। এমতাবস্থায় ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, যিনি স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানও আমার কাছ থেকে চাবির গোছা লোকমারফত নিলেন। যে যার মতো করে আমরা প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম।

মিলিটারী এসে গেছে। একদিন শুনলাম, মিলিটারী আমাকে খুঁজতে এসে বাড়িটি জ্বালিয়ে দেবে। যে কোন সময় আসতে পারে। ‘আইছে’ বলে শব্দ শুনলেই আমি এবং আরো অনেকে হাওরে গিয়ে নৌকায় নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিতাম। একদিন আমাদের বাড়ির দুটো বাড়ি পশ্চিমে পাক সেনারা এসেছে শুনে হাওড়ে গিয়ে পানিতে শরীর ডুবিয়ে কচুরিপানা মাথায় দিয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমি জোঁক খুব ভয় করি। জোঁকের কথা তখন মনেই ছিল না। বিপদ কেটে যাওয়ার সংবাদে উঠে এলাম, একটা জোঁকও আমাকে ধরেনি। অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকলে মা-বাবা আমাকে দূরে হাওড়পাড়ের এক গ্রামে পাঠিয়ে দিলেন। সেখানেও হানাদারের ভয় আছে। সবার পরামর্শে আমার ঝাঁকড়া চুল মুণ্ডন করা হলো। অবস্থান নিরাপদ নয়। গেলাম অন্য গ্রামের আত্মীয় বাড়ি। কয়েকদিন থেকে বুঝলাম, অন্ন সংস্থান করা তাদের জন্যে বড় কঠিন। সামান্য টাকা পুঁজির ব্যবস্থা করে আমাদের বাজার থেকে সস্তায় জ্বালানী কাঠ লাকড়ির আঁটি সংগ্রহ করে নৌকা বোঝাই করে ওদের বাজারে নিয়ে বিক্রি করবার ব্যবস্থা করতাম। এভাবে দু তিন চালান দিয়ে কিছু টাকা লাভ হলো। কদিন চলবার ব্যবস্থা হলো।

এদিকে খবর এলো আমাদের বাড়িতে উঠানে একটা বিড়াল বসে থাকে। মাঝে মাঝে ঘরে যায়। আবার উঠানে বসে থাকে। বাড়িতে মা-বাবা কেউ নেই। ওরা অন্যত্র কোথাও থাকেন। একদিন শুনলাম, আমাদের বাড়ি পাঞ্জাবিরা জ্বালিয়ে দিয়েছে। পরে শুনলাম, বাড়ি জ্বালায়নি, আমি সারেন্ডার করলে জ্বালাবে না। যাওয়ার জন্যে খবর আসতেই থাকলো। আমি মনে ভাবলাম, সারেন্ডার করা মানে-একটা গুলিতে আমাকে খতম।।

এরপর গ্রামের মুরুব্বীরা খবর দিলেন যাওয়ার জন্যে। সবশেষে মা-বাবা লোক পাঠালেন আমাকে নেওয়ার জন্য। এবার আমি মরতে প্রস্তুত। বাড়ি পৌঁছেই জানলাম, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান বলেছেন, আমার কিছু হবে না, শুধু তার অফিসে হাজির হতে হবে। এখানে মিলিটারী থাকবে না। গ্রামের সব মুরুব্বী মাতব্বরেরা আমার ভীতসন্ত্রস্ত পিতাসহ আমাকে নিয়ে গেলেন অফিসে। চেয়ারম্যান সাহেব দুঃখের কথা বললেন চাবির ব্যাপারে। আমি নির্বাক, মৃত্যু হলে হোক, দেশের মানুষের জন্যেই তো কাজ করেছি। আমার পিতাসহ মুরুব্বীরা তাঁকে অনুরোধ করলেন মাফ করে দেওয়ার জন্যে। ছাওয়াল মানুষ বুঝে নাই। এবার তিনি বললেন, তাকে আমিও স্নেহ করি। মাফ করে দিব, স্কুলটা সে খুলুক, এর দায়িত্ব নিক। স্কুল তো আপনাদেরই।

আমি এবার বললাম, আমাকে মাফ করেন, স্কুলের দায়িত্ব আমি নিতে পারব না। উনি বললেন, স্কুলের দায়িত্ব তুমি না নিলে আর কেউ যোগ্য দেখি না। তোমাকে স্কুল খুলতে হবে। নতুবা মিলিটারী স্কুল জ্বালিয়ে দিবে বলেছে। আর একবার জ্বালানো শুরু হলে তোমাদের গ্রামও জ্বলতে পারে, বাড়িঘর সব ছারখার হয়ে যাবে। আব্বাসহ মুরুব্বীরা চেয়ারম্যান সাহেবের কথা মেনে নেওয়ার জন্যে আমাকে চাপ দিতে থাকেন। মুরুব্বীরা বললেন, আমাদের এই মায়ার বাচ্চাটার যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আমি চিন্তা করলাম, স্কুল না খুললে আমার দান করা দুটি বড় বড় আলমিরা ভর্তি বইগুলোও পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এগুলো অনেক কষ্টে অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমার ব্যক্তিগত লাইব্রেরির জন্যে সংগ্রহ করেছিলাম।

আমি স্কুল খুলতে সম্মত হলাম। পরদিন বন্ধ স্কুল খুললাম। হিন্দু মুসলিম ছাত্র শিক্ষকে স্কুল চললো ভালোই। পাঞ্জাবিরা আশপাশের এলাকাগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে অত্যাচার চালায়। কানে আসে সে কথা। ভয়ে ভয়ে দিন যায়। কিছুদিন পর পাঞ্জাবিরা এই ক্যাম্প উঠিয়ে নেয়। আরো কিছুদিন দীর্ঘ রজনীর অমানিশা শেষে প্রত্যাশা পূরণ করে লাল সূর্য উদিত হলো- আমাদের স্বাধীনতার সূর্য। আমাদের সকল আশা ও আনন্দের উৎসব লাল সবুজ পতাকা উড়তে থাকলো। অফুরান আনন্দ বন্যা অন্তরে-ঘরে বাইরে। এরই মধ্যে ঐ ভারত-ফেরত ভদ্রলোক দেশে এসে বড় নেতার মতো গর্জে গর্জে কথা বলতে শুনলাম। স্কুলের মিটিং ডাকা দরকার। মিটিং হলো। স্কুল চলতে থাকলো নতুন উদ্যমে। আমি নতুন শিক্ষক এনেছি। গ্রামে গ্রামে স্কুলের জন্যে আমি ধান সংগ্রহে ব্যস্ত। ভারত-ফেরৎ কর্তাবাবু সহচরবৃন্দকে নিয়ে আমার সম্পর্কে নানা কথা তুলছেন। পরের মিটিং এ একটু বুঝলাম, আমাকে বলতে চায়, আমার গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি নেই। আমার নিয়োগকৃত এক হিন্দু শিক্ষকের সেটা আছে। তহবিল সম্পর্কেও কিছু কথা কানে এলো। কীসের তহবিল, কীসের টাকা। টাকার অভাবে আমাদের বাঁশঝাড়গুলো সাফ করে নিয়ে স্কুলের চারিদিকে বেড়া দিয়েছি, স্কুলের বাঁশের খুঁটি বদলিয়েছি। ঋণের টাকায় বেতন দিয়েছি। কানে আসে, আমার কাছে আসা সব চিঠিপত্র জব্দ করা হবে। ভাবলাম, স্কুল ভালো চলুক, আমি না থাকলে কী।
মনের দুঃখে আমি রিজাইন দিলাম।

পরদিনই ঝড়ে একটি ঘর পড়ে গেল।
তখন ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা আমি। আমার দেয়া শিরোনামে খবর প্রকাশিত হলোঃ
‘বিদ্যের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু, তুফানে পড়িয়া গেল।
সবাই বললো, তোমার অভিশাপের ফল।
এ স্কুলকে আমি কখনো অভিশাপ দিতে পারি? এ স্কুল আমার প্রাণের টুকরা। পরবর্তীতে এ স্কুলের সভাপতির দায়িত্বও আমাকে পালন করতে হয়েছে।


( লেখকঃ প্রিন্সিপাল শামস উদ্দীন আহমদ।
লেখাটি লেখকের তৃতীয় প্রকাশিত ছোট গল্পের বই –
‘কার্বন পাগলা ও অন্যান্য ‘ থেকে নেওয়া)

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102