

বিজয়ে মাসে বাঙালি বিজয়ের বেশেই এগিয়ে যাবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী মঙ্গলবার (১৯ ডিসেম্বর) আমরা যে বিজয় র্যালি করব, তা বিজয়ের বেশে যেন সারা দেশে উদযাপিত হয়। সেটা হবে এই খুনি, সন্ত্রাসী ও অগ্নিসন্ত্রাসীদের কাছে একটা জবাব।
রবিবার (১৭ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিজয় দিবসের আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি। এসময় কুয়েতের আমিরের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণার পাশাপাশি তার রুহের মাগফেরাত কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, কুয়েতের আমির শেখ নাওয়াফ আল-আহমাদ আল-জাবের আল-সাবাহ শনিবার (১৬ ডিসেম্বর) মারা যান। তার প্রতি সম্মান দেখাতে সোমবার (১৮ ডিসেম্বর) দেশে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। এ কারণে আ. লীগের বিজয় শোভাযাত্রাও একদিন পিছিয়ে দেয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।

এসময় শেখ হাসিনা বলেন, সোমবার আমাদের যে বিজয় র্যালি হওয়ার কথা সেটা আমরা করব না। কারণ, ওইদিন আমরা কুয়েতের আমিরের মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছি। সেদিন আমাদের পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। আমরা কাল রাষ্ট্রীয় শোক পালন করব। আর আমাদের র্যালিটা হবে পরের দিন ১৯ ডিসেম্বর। বিজয় র্যালি বিজয় বেশে যেন উদযাপিত হয় সেই আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বিজয় র্যালি খুনি-সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটা জবাব।
আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ ও উপপ্রচার সম্পাদক সৈয়দ আবদুল আউয়াল শামীমের সঞ্চালনায় আলোচনাসভায় আরো বক্তব্য রাখেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, সুজিত রায় নন্দী, কার্যনির্বাহী সদস্য আমিরুল ইসলাম মিলন, আনোয়ার হোসেন, মেরিনা জাহান কবিতা, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির।
দুর্বৃত্ত ও অগ্নিসন্ত্রাসী ও খুনিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আ. লীগ সভাপতি বলেন, যারা মানুষ খুন করার জন্য রেললাইনের পাত খুলে দেয়, রেললাইন কেটে রাখে, আর আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায় এদের বিরুদ্ধে সারা দেশের মানুষকে প্রতিরোধ গড়তে হবে। রেললাইন থেকে শুরু করে সব জায়গায় পাহারা বসাতে হবে। যারাই আগুন লাগাতে যাবে, ফিসফ্লেট খুলতে যাবে, রেললাইন কাটতে যাবে সঙ্গে সঙ্গে তাদের ধরিয়ে দিয়ে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে। এদের এই ধ্বংসাত্মক কাজ এদেশে চলতে পারে না।
তিনি বলেন, ওরা হরতাল দিয়ে লুকিয়ে বসে থাকে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে। এত টাকা তারা পায় কোথা থেকে? এরা বাসে আগুন, গাড়িতে আগুন…একটার পর একটা আগুন দিচ্ছে। সেই পোড়া মানুষগুলোর চিকিৎসায় সাধ্যমতো আমরা সহযোগিতা করে যাচ্ছি। কিন্তু সাধারণ কেন মানুষ স্বাধীনভাবে চলতে পারবে না? কেন বারবার তাদেরকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করাবে। কেন তাদের আগুন দিয়ে পুড়তে হবে। সেটাই আমার প্রশ্ন।
হরতাল-অবরোধে বিএনপি নিজেরাই অবরুদ্ধ হয়ে যায় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া বছরের পর বছর অবরুদ্ধ। ২০১৪ সালে যে অবরোধ তিনি দিয়েছিলেন, তা এখনো তুলেনি। এখন আবার অবরোধ আর হরতাল। কভিড আর বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে আমরা কেবল উঠে আসছি। তখন আবার আসলো ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, স্যাংশন আর পাল্টা স্যাংশন। সেটাও মোকাবিলা করে যখন অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি সেসময় ফের অগ্নিসন্ত্রাস, হরতাল আর অবরোধ করে দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের মানুষ কী এটা মেনে নেবে? উপস্থিত জনতা সমস্বরে বলে উঠে ‘না’। তিনি এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান।
বিএনপি নির্বাচন বানচাল করতে চায় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এরা মানুষের কল্যাণ চায় না, লুটপাটের রাজত্ব চায়। এরা ভোটে যেতে সাহস পায় না। কারণ এরা জানে তারা অগ্নিসন্ত্রাসী, খুনি। এদের বাংলাদেশের মানুষ ভোট দেবে না। সেজন্যই তারা নির্বাচন বানচাল করতে চায়, সরকার উৎখাত করতে চায়।
বিষয়টি নিয়ে তিনি আরো বলেন, নির্বাচন এসেছে, বিএনপি নানা ফ্যাকরা বের করেছে। তারা ইলেকশন করবে না। আমার প্রশ্ন তারা ইলেকশনটা করবে কীভাবে? ওদের দলের তো মাথা নাই, একটা ধর দিয়ে চলছে। সেটাও গুলশান আর পল্টনে। সবকিছু ওখান থেকে……আর কোন অন্ধকার জায়গা থেকে যে কথা বলে।
বিএনপি আন্দোলনের নামে মানুষ পোড়ায় ও মৃত্যুর ফাঁদ পেতে মানুষ হত্যা করার অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনা বলেন, লন্ডনে বসে হুকুম দেয় আর এখান থেকে আগুন দেয়। সে হুকুমে যারা আগুন দেয় তারা কী মনে করে? এই আগুন নিয়ে খেলা! এই খেলা ভালো না। বাংলাদেশের মানুষ কখনো এটা মেনে নেবে না। দেশের মানুষকে আহ্বান জানাবো অগ্নিসন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ওরা হরতাল দিয়ে লুকিয়ে থাকে। ঘরে বসে থাকে। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে। ওই টাকা পায় কোথায়? জনগণের সব টাকা মানি-লন্ডারিং করে বাইরে নিয়ে গেছে। জানি না বিএনপির নেতারা কী করে। তাদের একজন বলেছিলো, আমরা যখন পল্টনে তারেক কেন লন্ডনে?
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপির চরিত্র কখনো বদলাবে না। এরা জনগণের কল্যাণ আর মঙ্গলের কথা চিন্তা করে না। এরা নিজেদেরকেই নিয়ে ব্যস্ত। এটাই হলো বাস্তবতা। যে কারণেই ২০০১ সালে তারা ক্ষমতায় এসে জনগণের ভোট চুরি, নিজেদের অর্থ সম্পদ বানানো, বিদেশে অর্থ পাচার, মানি লন্ডারিং এবং এতিমের অর্থ পর্যন্ত আত্মসাৎ করে। আর এখন এদের থেকে বড় বড় কথা শুনতে হয়। এটাই বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য।
বিগত সংসদে বিএনপির নির্বাচিত কয়েকজন সংসদ সদস্যের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি কয়েকটা সিট পেয়েছিল। তারা পার্লামেন্টে ছিল। আমরা পার্লামেন্টে তাদের সবরকম সুযোগ দিতাম। তারা যত রকম যা বলার ইচ্ছামতো বলত।
বিএনপির এমপিদের পদত্যাগ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের পদত্যাগের কোনো কারণ ছিল না। তারা অনুসরণ করতে চায়। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, বিএনপির আমলে প্যালেস্টাইন আক্রমণ হচ্ছিল ইহুদিদের দ্বারা। সেভরনে মসজিদে ৬০ জন মুসল্লিকে ইজরাইলের লোকেরা হত্যা করে। আমরা প্রতিবাদ করেছিলাম। পার্লামেন্টে রেজ্যুলেশন আনার জন্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আমরা প্রস্তাব দেই। তখন বিএনপি সরকারী দলে। আমরা বললাম… এর প্রতিবাদ করেন, তারা করেনি। আমরা প্রতিবাদ করব, সেটাও করতে দেবে না। তাই পার্লামেন্ট থেকে আমরা বের হয়ে যাই, পদত্যাগ করি। এবার প্যালেস্টাইনে আক্রমণের ঘটনায় আমরা পার্লামেন্টে রেজ্যুলেশন নিয়েছি, বিবৃতি দিয়েছি, পার্লামেন্টে আলোচনাও করেছি। আমরা সবসময় প্যালেস্টাইনের ভাইবোনদের পক্ষে। কারণ আমরা নীতি নিয়ে চলি, নির্যাতিত মানুষের পাশে থাকি।

সরকারের উন্নয়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে আমরা জনগণের স্বাক্ষরতার হার বাড়িয়েছি। চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি। বিনা পয়সায় ওষুধ দিচ্ছি। বিনা পয়সায় ভ্যাকসিন দিয়েছি। মানুষের সার্বিক কল্যাণে কাজ করছি। গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষকে ঘর করে দিচ্ছি। খাদ্যে দেশ স্বয়ম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। বিনা পয়সায় খাবার দিচ্ছি। সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বিশেষ ফ্ল্যাট করে দিচ্ছি। প্রতি ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিয়েছি। রাস্তা-ঘাট করে দিয়েছি।
সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আজকের বাংলাদেশ বদলে যাওয়া বাংলাদেশ শিক্ষায়-দীক্ষায়, জ্ঞানে অনেক এগিয়েছে। এটা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এই কথাটা দেশ-বিদেশে সবাই বোঝে, বুঝে না এখানে কতগুলি মানে…বুদ্ধি বেচিয়া জীবিকা নির্বাহ করে যাহারা, তাহারাই বোঝে না। সাধারণ মানুষ কিন্তু বুঝে। তারা আছে আমাদের সঙ্গে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ জানে তাদের কিসে ভাল, কিসে মন্দ। তারা জানে কোন দল ক্ষমতায় থাকলে তাদের কল্যাণ হয়।
আওয়ামী লীগকে কেউ উৎখাত করতে পারবে না মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ কোনো অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীর পকেট থেকে উঠে আসেনি। এ দল এদেশের মাটি ও মানুষের সংগঠন। অন্যায়ের সঙ্গে প্রতিবাদ করেই এই সংগঠন গড়ে উঠেছে। কাজেই এই সংগঠনের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। আর প্রোথিত এই আওয়ামী লীগকে কেউ কোনোদিনই উৎখাত করতে পারবে না এবং দাবাতেও পারবে না। কারণ আমরা ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার আন্দোলন-সংগ্রাম করেছি। নির্বাচনী সংস্কার করেছি। জনগণের ভোটের অধিকার জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছি। কাজেই জনগণই সিদ্ধান্ত নেবে কাকে তারা নির্বাচিত করবে, কে সরকারে আসবে। অগ্নিসন্ত্রাস আর খুন করে জনগণের হৃদয় জয় করা যায় না। এটা বিএনপির জানা উচিত। এটা বুঝেই তাদের চলা উচিত।
নিউজ /এমএসএম