

নিউজ ডেস্ক: একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র উদৌগে আফগানিস্তান বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আলোচনার বিষয় ছিল: ‘আফগানিস্তানে আসন্ন তালেবান ক্ষমতাদখলের পরিণাম’।সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নির্মূল কমিটির সভাপতি লেখক,সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহরিয়ার কবির।
সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের‘আফগান ইন্টেলেকচুয়ালস গ্লোবাল কমিউনিটি’র সভাপতি,আফগান বিশেষজ্ঞ লেখক ড. শাহী সাদাত, ব্রাসেলসের সাউথএশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এর প্রাক্তন সদস্য মানবাধিকার নেতা পাওলোকাসাকা, সুইডেনের উপসালা ইউনাইটেড নেশনসঅ্যাসোসিয়েশন-এর অ্যাটর্নি মোনা স্ট্রিন্ডবার্গ, প্যারিসের ইনষ্টিটিউট ডি রিসার্চ এট ডিটিউডস স্ট্র্যাটেজিকস ডি খাইবার(আইআরইএসকে)-এর সভাপতি, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল এর প্রতিনিধি পশতুন নেতা ফজল-উর রেহমান আফ্রিদি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন হোসেন বাদশা এমপি,ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট, ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বাংলাদেশ -এর নির্বাহী পরিচালক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অব.মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবদুর রশিদ, ব্রিটিশ মানবাধিকার নেতা কলামিস্ট জুলিয়ান ফ্রান্সিস, ভারতের দৈনিক পাইওনিয়ার -এর উপদেষ্টা সম্পাদক লেখক সাংবাদিক হিরন্ময়কার্লেকার, পাকিস্তানের মানবাধিকার নেত্রী, অর্থনৈতিক উন্নয়নগবেষক-পরিকল্পক ও শান্তিরক্ষা কর্মী তাহিরা আবদুল্লাহ,যুক্তরাজ্যের ওয়ার্ল্ড সিন্ধি কংগ্রেস-এর সাধারণ সম্পাদক মানবাধিকার নেতা ড. লাকুমাল লুহানা, যুক্তরাজ্যের রাজনীতিও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন, নির্মূল কমিটির সর্বইউরোপীয় শাখার সভাপতি তরুণ কান্তি চৌধুরী, নির্মূলকমিটির সর্বইউরোপীয় শাখার সাধারণ সম্পাদক আনসারআহমদ উল্লাহ ও জাতিসংঘের শিশু অধিকার সম্পর্কিতকমিটির সদস্য ফয়সাল হাসান তানভীর।
ইউরোপ, আমেরিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার ১২টি দেশের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, বুদ্ধিজীবী এবং আইনপ্রণেতাদের স্বাগত জানিয়ে সম্মেলনের সভাপতি শাহরিয়ার কবির তার উদ্বোধনী বক্তৃতায় বলেন, ‘আফগানিস্তান থেকে মার্কিন এবং ন্যাটো বাহিনী প্রত্যাহারের কারণে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। আমাদের বিশ্বাস, এর ফলে আফগানিস্তান এর মানুষের জীবন ও জীবিকার পাশাপাশি দক্ষিণএশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও শান্তি বিপন্ন হবে।আমরা ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে পূর্ববর্তী তালেবানশাসনকালে মানব সভ্যতার নিদর্শন ধ্বংস, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড,মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিশেষভাবে বুদ্ধিজীবী,রাজনীতিবিদ, নারী ও শিশুদের ভয়ঙ্কর অবস্থা প্রত্যক্ষ করেছি।সে সময় জামায়াতে ইসলামী, হরকাতুল জিহাদ এবং অন্যান্য ইসলামী সংগঠন পাঁচ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশিক তথাকথিত জিহাদে অংশগ্রহণের জন্য আফগানিস্তানে প্রেরণকরেছিল। মোল্লা উমরের সরকার পতনের পর তারা ফিরে এসে সমগ্র দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। তালেবান এবং আল কায়েদার মতো জিহাদিরা কোনও দেশের রাজনৈতিক বা ভৌগলিক সীমানার পরোয়া করে না। যদি পশ্চিমা শক্তিগুলো আফগান জনগণের দুর্দশার কথা চিন্তা না করে আফগানিস্তান,পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশে তালেবান-আল-কায়েদার মতো জঙ্গিদের ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনুমোদন করে তবে অদুর ভবিষ্যতে আমাদের ৯/১১-এর মতো বহু ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে হতে পারে। সেজন্য আজকের সম্মেলন থেকে আমরা আফগানিস্তান এর আসন্ন তালেবান দখলের বিরুদ্ধে বিশ্বের আলোকিত নাগরিক সমাজকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাই এবং আফগানিস্তানে তালেবানসহ সমস্ত জঙ্গীদের নির্মূল এবং শান্তি পুনরুদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত ন্যাটো-র উপস্থিতির দাবি জানান।’
ব্রাসেলসের সাউথ এশিয়া ডেমোক্রেটিক ফোরামের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক এমইপি পাওলো কাসাকা বলেন, ‘আফগানিস্তানে তালেবান শাসন দেশটির জনগণ, বিশেষ করে আফগান মহিলাদের স্বাধীনতা খর্ব করেছে। উপরন্তু,তালেবানরা দেশটিকে ৯/১১-এর জঙ্গী হামলার মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গীবাদ বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে রূপান্তরিত করেছে। বিশ বছর পরও, তালেবানদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। মানবাধিকার, বিশেষ করে মহিলাদের অধিকারের ক্ষেত্রে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হয়নি। তারা সব সময় আন্তর্জাতিক জনমত উপেক্ষা করেছে।তালেবানের শাসন আফগানদের জন্য, প্রতিবেশীদের জন্য এবংআন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য প্রচণ্ড হুমকি স্বরূপ।মানবাধিকারে বিশ্বাসী সকলের কর্তব্য আফগানদের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের জন্য তাদের পাশে থাকা।’
পশতুন নেতা এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতিনিধি ফজল-উর রেহমান আফ্রিদি বলেন, ‘আফগানিস্তানের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তালেবানরা একের পর এক এলাকা দখল করে জনসাধারণের সম্পদ বিনষ্ট করছে, আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে,গাড়িবোমা হামলা করছে, মহিলাদের হত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে এবং যুদ্ধবন্দীদের তাৎক্ষণিক হত্যা করছে। যদি তালেবানরা পুনরায় কাবুল দখল করে তবে আমি মনে করি,নারীর ক্ষমতায়ন, মানবাধিকার এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সুরক্ষা, গণতন্ত্র এবং রাষ্ট্রীয় স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে যে অগ্রগতি সাধিত হয়েছেতার সবই বিলুপ্ত হবে। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে,আফগানিস্তানের এই ধ্বংসের পিছনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মদত রয়েছে। আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে তারা তালেবানদের প্রশিক্ষণ, অর্থ ও রসদ সরবরাহ করে নির্বাচিত আফগান সরকারের বিরুদ্ধে তালেবানদের প্রত্যক্ষ সমর্থনপ্রদান করছে। পাকিস্তানের জঙ্গী সংগঠনগুলো, সাধারণজনগণ এমনকি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত গণমাধ্যমওপ্রকাশ্যে তালেবানদের দ্বারা আফগানিস্তান ধ্বংস করছে। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ওপশ্চিমাদের সঙ্গেই দ্বিচারিতা করেনি, নিজের দেশের জনগণ ওপার্লামেন্টের সঙ্গেও দ্বিচারিতা করেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, তালেবানরা যদি পুনরায় কাবুল দখল করে তাহলে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এবং এ অঞ্চলে ইসলামি জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থিদের উত্থান ঘটবে। তারা ভারতীয় কাশ্মীর অজ্ঞ্চল অস্থিতিশীল করবে এবং এর ফলে ৯০-এর দশকের মতো বাংলাদেশে পুনরায় জঙ্গী সংগঠনগুলির পুনরুত্থান ঘটবে।’
প্রবীণ ভারতীয় সাংবাদিক ও ‘এন্ড গেম ইন আফগানিস্তান: ফরহোম দ্যা ডাইস রোলস’ গ্রন্থের লেখক হিরন্ময় কার্লেকার বলেন, ‘তালেবান সম্পর্কে কারও ভ্রান্ত ধারণা থাকা উচিত নয়। তারা ইসলাম সম্পর্কে বিকৃত ধারণা পোষণ করে এবং সারা বিশ্বে সরিয়া আইন কায়েম করার অঙ্গিকারবদ্ধ একটি জেহাদি দল।তাছাড়া, তারা একেবারে ধর্মান্ধ গোঁয়ার যারা তাদের লক্ষ্যে নাপৌঁছানো পর্যন্ত বা বিধ্বস্ত না হওয়া পর্যন্ত থামবে না।আফগানিস্তানে তারা ক্ষমতায় এলে বিশ্বর কোথাও কেউ শান্তিতে বসবাস করতে পারবে না। আফগানিস্তান পুনরায় বিশ্ব ব্যাপী চারণক্ষেত্রে পরিণত হবে। এছাড়া, তাদের বিজয় বিশ্বের সর্বত্র জেহাদিদের মনোবলকে ব্যাপকভাবে চাঙ্গা করবে। এরপর তারা এককভাবে অথবা সংঘবদ্ধভাবে সর্বত্রহামলা শুরু করবে। অতএব, তালেবানকে আফগানিস্তান থেকে মূলোৎপাটন করার বিকল্প নেই।’
ব্রিটিশ মানবাধিকার নেতা কলামিস্ট জুলিয়ান ফ্রান্সিস বলেন, ‘৯/১১-এর ধ্বংসযজ্ঞের পর, গত ২০ বছরে আফগানিস্তানে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে, বিশেষত মেয়ে এবং নারীদের সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে। তালেবানি পশ্চাৎপদ শক্তিসমূহ যদি আফগানিস্তান এ পুনরায় আধিপত্য বিস্তার করে, তবে অন্যান্যদেশগুলিতে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় আরও বিভিন্ন জঙ্গী গোঁষ্টী এ থেকে উৎসাহিত হতে পারে। খুব বেশি দিন হয়নি,বাংলাদেশে হেফাজত দাবি করছিল- মেয়েদের কেবল পঞ্চমশ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করা উচিত। আফগানিস্তানে যা ঘটতে পারে তা ধারণার বাইরে। আফগানিস্তান বা অন্য কোথাও আলকায়েদা, আইসিস এবং তালেবানদের অশুভ দখলদারিত্বের অনুমতি বিশ্ববাসীর দেয়া উচিত হবে না। ন্যাটোকে প্রচণ্ড চাপপ্রদান করা উচিত যেন তারা আফগানিস্তান ত্যাগ না করে।রক্তপিপাসু তালেবান ও আল কায়েদাকে দাঙ্গা চালানোর সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিৎ। কারণ, এতে নিশ্চিতভাবে দক্ষিণএশিয়ার অন্যান্য দেশগুলিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিপন্নহবে।’
পাকিস্তানের মানবাধিকার নেত্রী, অর্থনৈতিক উন্নয়ন গবেষক-পরিকল্পক তাহিরা আবদুল্লাহ বলেন, ‘আফগানিস্তান ওআফগান তালেবানকে পুরনো কৌশলগত কারণে পাকিস্তানের সমর্থন না দেয়ার ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার এটাই প্রকৃতসময়।’তিনি পাকিস্তানকে শুধুমাত্র আফগান পশতুন গোষ্ঠীরসঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন বন্ধ করে আফগানিস্তানের সমস্ত রাজনৈতিকদল, মোর্চা, নৃগোষ্ঠী, ধর্মনিরপেক্ষ নাগরিক সমাজ,মানবাধিকার সংগঠন ও মুক্ত গণমাধ্যমের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সমর্থন করার আহ্বান জানান।তিনি জোরদিয়ে বলেন, ‘আফগান-টিটিএ-এর সঙ্গে শান্তি আলোচনায় পাকিস্তান এর হস্তক্ষেপ করা বা মধ্যস্ততা করা মোটেই উচিত হবেনা। এটি আফগানিস্তানের একান্ত অভ্যন্তরীণ বিষয়, যাতাদেরকেই সমাধান করতে হবে। আফগানিস্তানে হস্তক্ষেপ করার অধিকার অন্য কোন আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রের নেই।’তিনি ন্যায়বিচারের পাশাপাশি শান্তি- বিশেষত দক্ষিণ এবং মধ্যএশিয়া জুড়ে ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল আদর্শ প্রচারের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক জনাব ফজলেহোসেন বাদশা এমপি বলেন, ‘পাকিস্তানের ভেতরে তালেবানদের যে অবস্থান, তা নতুন করে বলার কিছু নেই।রক্তাক্ত ইরাক যেমন মধ্যপ্রাচ্য হয়ে এশিয়া পর্যন্ত প্রভাব ফেলেছিল, তেমনি সংঘাতময় আফগানিস্তান প্রকৃতপক্ষে পুরোদক্ষিণ এশিয়াকেই অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। কাজেই আফগানিস্তান এর ভবিষ্যৎ সংকট নিয়ে আমাদের এখনই মনোযোগী হতে হবে। এটা কোনো একক রাষ্ট্রের মাথা ব্যাথা নয়। সম্মিলিতভাবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো এই ইস্যুতে কাজ করতেনা পারলে আগামীতে সবাইকেই এর মাশুল গুণতে হবে। সেক্ষেত্রে আফগানিস্তানও যুক্ত রয়েছে। মনে রাখতে হবে, সার্বিকনিরাপত্তা, শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পারস্পরিক সহায়তাতৈরির মাধ্যমেই শুধু দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্র অর্থনৈতিকসমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এশিয়ার সকল দেশকে শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের পথ অন্বেষণের পন্থা খুঁজে বের করতে হবে।’
সভায় সকল বক্তা আফগানিস্তানে সম্ভাব্য তালেবান দখল দারিত্বের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ সহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্হাকে কার্যকর ভূমিকা গ্রহণের পাশাপাশি জঙ্গিবাদ ওসন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত সংগঠনে নির্মূল কমিটিকে অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।