

তাওহিদের ঘোষণায় শুরু হবে ১৪৪৪ হিজরির ২১তম তারাবিহ। আজকের তারাবিহতে সুরা যুমার (৩২-৭৫) সুরা মুমিন এবং সুরা হা-মিম আস-সাজদা (১-৪৬) পড়া হবে। সে সঙ্গে ২৪তম পারার তেলাওয়াত শেষ হবে। আল্লাহ তাআলার প্রতি মিথ্যা আরোপকারীদের পরিচয়ে শুরু হবে আজকের তারাবিহ। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنۡ کَذَبَ عَلَی اللّٰهِ وَ کَذَّبَ بِالصِّدۡقِ اِذۡ جَآءَهٗ ؕ اَلَیۡسَ فِیۡ جَهَنَّمَ مَثۡوًی لِّلۡکٰفِرِیۡنَ
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে আর সত্য সমাগত হওয়ার পর তা অস্বীকার করে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে আছে? (এমন) কাফিরদের আবাসস্থল কি জাহান্নামে নয়?’ (সুরা যুমার: আয়াত ৩২)
আজ তারাবিহের মুসল্লিরা আল্লাহর রহমতের ওপর আস্থা রাখার প্রাণশক্তি ফিরে পাবে। কারণ আজ হাফেজে কোরআনগণ মহান রবের সে আশার বাণী ঘোষণা করবেন। আজকের তারাবিহের আলোচ্য বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো-
সুরা যুমার (৩২-৭৫)
সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ। সুরাতুল গোরাফ নামেও এটি পরিচিত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হলেও হজরত হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকারী সম্পর্কিত যে তিনটি আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে, আয়াত তিনটি মদীনায় অবতীর্ণ। এ সুরার অধিকাংশ বক্তব্য তাওহিদ সম্পর্কিত। যারা তাওহিদে বিশ্বাস করে, তাদের পুরস্কার; যারা অবিশ্বাস করে তাদের শাস্তির কথাও এ সুরায় ঘোষিত হয়েছে। মানবতার কলংক শিরক তথা অংশীবাদের বাতুলতা ঘোষণা করা হয়েছে।
কেয়ামতের দিন কাফের ও মোশরেকদের টেনেহিঁচড়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে আর মুত্তাকিদের জান্নাতে প্রবেশের জন্য আহ্বান করা হবে। ফেরেশতারা তাদের অভ্যর্থনা জানাবেন, তাদের খেদমতে সালাম পেশ করবেন আর তারা আল্লাহর প্রশংসা করতে করতে আপন নিবাস জান্নাতে প্রবেশ করবেন। সর্বশেষ আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিবসে বান্দাদের মধ্যে ন্যায় বিচারভিত্তিক ফয়সালা করবেন। যাতে আল্লাহ তাআলার শ্রেষ্ঠত্ব, মাহাত্ম্য এবং গুণাবলী সন্নিবেশিত হয়েছে।
আজকের তারাবিহের শুরুতে হাফেজে কোরআনদের কণ্ঠে তেলাওয়াত হবে-
فَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنۡ کَذَبَ عَلَی اللّٰهِ وَ کَذَّبَ بِالصِّدۡقِ اِذۡ جَآءَهٗ ؕ اَلَیۡسَ فِیۡ جَهَنَّمَ مَثۡوًی لِّلۡکٰفِرِیۡنَ
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে আর সত্য সমাগত হওয়ার পর তা অস্বীকার করে তার চেয়ে বড় জালিম আর কে আছে? (এমন) কাফিরদের আবাসস্থল কি জাহান্নামে নয়?’ (সুরা যুমার: আয়াত ৩২)
আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা দাবি করে যে, আল্লাহর সন্তান-সন্ততি অথবা তাঁর শরিক আছে কিংবা তাঁর স্ত্রী আছে, অথচ তিনি এই সমস্ত জিনিস থেকে পাক ও পবিত্র। যাতে আছে তাওহিদ (আল্লাহর একত্ব), (দ্বীনের) বিধি-বিধান ও ফরজ কার্যাদি, পুনরুত্থান সম্পর্কীয় আকীদা ও বিশ্বাস, হারাম কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ এবং মুমিনদের জন্য সুসংবাদ ও কাফেরদের জন্য ধমক ও শাস্তির কথা। এ হল সেই দ্বীন ও শরিয়ত, যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিয়ে আগমন করেছেন। এটাকে তারা (অবিশ্বাসীরা) মিথ্যা মনে করে।
পরের আয়াতে আল্লাহ তাআলা সত্যবাদী মুত্তাকি বান্দাদের পরিচয় এভাবে তলে ধরেছেন-
وَ الَّذِیۡ جَآءَ بِالصِّدۡقِ وَ صَدَّقَ بِهٖۤ اُولٰٓئِکَ هُمُ الۡمُتَّقُوۡنَ
‘আর যারা সত্য নিয়ে এসেছে এবং সত্যকে সত্য বলে মেনে নিয়েছে, তারাই তো আল্লাহ-ভীরু, মুত্তাকি।’ (সুরা যুমার: আয়াত ৩৩)
এ থেকে নবিজি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। যিনি সত্য দ্বীন নিয়ে আগমন করেছেন। কারো কারো নিকট এ কথাটি সাধারণ এবং এর লক্ষ্য এমন সকল ব্যক্তি, যারা তাওহিদের দাওয়াত দেয় এবং আল্লাহর শরিয়তের প্রতি মানুষকে পথপ্রদর্শন করে। কেউ কেউ এ থেকে হজরত আবু বাকার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বুঝিয়েছেন। যিনি সর্ব প্রথম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সত্যায়ন করেছেন এবং তাঁর উপর ঈমান এনেছেন। আবার কেউ কেউ এটাকে সাধারণ গণ্য করেছেন। যা সেই সব মুমিনকে শামিল করে, যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালতের প্রতি ঈমান রাখেন এবং তাঁকে সত্য নবি বলে মনে করেন।
অবিশ্বাসীরা আসমান-জমিন সৃষ্টিতে আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা মানলেও তারা আল্লাহ তাআলার বিরোধিতা করে। আল্লাহ তাআলা বিষয়টি কোরআনুল কারিমে এভাবে তুলে ধরেছেন-
وَ لَئِنۡ سَاَلۡتَهُمۡ مَّنۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضَ لَیَقُوۡلُنَّ اللّٰهُ ؕ قُلۡ اَفَرَءَیۡتُمۡ مَّا تَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰهِ اِنۡ اَرَادَنِیَ اللّٰهُ بِضُرٍّ هَلۡ هُنَّ کٰشِفٰتُ ضُرِّهٖۤ اَوۡ اَرَادَنِیۡ بِرَحۡمَۃٍ هَلۡ هُنَّ مُمۡسِکٰتُ رَحۡمَتِهٖ ؕ قُلۡ حَسۡبِیَ اللّٰهُ ؕ عَلَیۡهِ یَتَوَکَّلُ الۡمُتَوَکِّلُوۡنَ
‘আর তুমি যদি তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, কে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছে? তারা অবশ্যই বলবে ‘আল্লাহ’। বল, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ- আল্লাহ আমার কোনো ক্ষতি চাইলে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ডাক তারা কি সেই ক্ষতি দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমাকে রহমত করতে চাইলে তারা সেই রহমত প্রতিরোধ করতে পারবে’? বল, ‘আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট’। তাওয়াক্কুলকারীগণ তাঁর উপরই তাওয়াক্কুল করে।’ (সুরা যুমার: আয়াত ৩৮)
কেউ কেউ বলেন যে, যখন নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উল্লিখিত প্রশ্ন তাদের সামনে পেশ করলেন, তখন তারা বলল যে, সত্যিই তারা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত কোনো জিনিসকে দূর করতে পারবে না, তবে তারা সুপারিশ করবে। এরই ভিত্তিতে এই অংশটুকু অবতীর্ণ হয়েছে যে, সমস্ত কার্যকলাপের ব্যাপারে আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট।
যখন সমস্ত কিছু তাঁরই এখতিয়ারে, তখন অন্যের উপর নির্ভর করায় লাভ কি? এই জন্য ঈমানদারেরা কেবল তাঁরই উপর নির্ভর করে থাকে। তিনি ছাড়া অন্য কারো উপর তারা নির্ভর করে না, ভরসা ও আস্থা রাখে না।
মানুষের সঠিক পথ নির্দেশনার জন্য আল্লাহ তাআলা কোরআনুল কারিম নাজিল করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
اِنَّاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ لِلنَّاسِ بِالۡحَقِّ ۚ فَمَنِ اهۡتَدٰی فَلِنَفۡسِهٖ ۚ وَ مَنۡ ضَلَّ فَاِنَّمَا یَضِلُّ عَلَیۡهَا ۚ وَ مَاۤ اَنۡتَ عَلَیۡهِمۡ بِوَکِیۡلٍ
‘নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি যথাযথভাবে কিতাব নাজিল করেছি মানুষের জন্য; তাই যে সৎপথ
অবলম্বন করে, সে তা নিজের জন্যই করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের ক্ষতির জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। আর তুমি তাদের তত্ত্বাবধায়ক নও।’ (সুরা যুমার: আয়াত ৪১)
মক্কাবাসীদের কুফরির উপর অটল থাকা নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য ছিল বড়ই কষ্টকর। তাই এই আয়াতে তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়া হয়েছে যে, তোমার দায়িত্ব কেবল এই কিতাবের কথা বর্ণনা করে দেওয়া, যা আমি তোমার উপর অবতীর্ণ করেছি। তাদেরকে হেদায়াত দান করার দায়িত্ব তোমার নয়। যদি তারা হেদায়াতের পথ অবলম্বন করে নেয়, তবে তাতে তাদেরই লাভ। আর যদি তা অবলম্বন না করে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত তারাই হবে।
পরবর্তী আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর এমন এক পরিপূর্ণ কুদরতের এবং বিস্ময়কর কর্মের কথা উল্লেখ করছেন, যা মানুষ প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করে। আর তা হল, যখন সে ঘুমিয়ে যায়, তখন তার আত্মা আল্লাহর নির্দেশে তার (দেহ) থেকে যেন বেরিয়েই যায়। কেননা, তখন তার অনুভূতি ও বোধশক্তি বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর যখন সে জেগে ওঠে, তখন আত্মাকে ঠিক যেন তার মধ্যে পুনরায় প্রেরণ করা হয়। ফলে তার অনুভূতি আগের ন্যায় ফিরে আসে। অবশ্য যার জীবনের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যায়, তার আত্মা আর ফিরে আসে না এবং সে মৃত্যুর হাতে ধরা খায়। এটাকেই মুফাসসিরগণ ‘ওয়াফাতে কুবরা’ (বড় মৃত্যু) এবং ‘অফাতে সোগরা’ (ছোট মৃত্যু) বলে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন-