

ভোক্তাস্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করছে সরকারি সংস্থা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ভোক্তার অভিযোগের নিষ্পত্তির পাশাপাশি বাজারে বিভিন্ন পণ্যে কারসাজি ঠেকাতে সারাদেশে নিয়মিত তদারকি চালায় সংস্থাটি। অভিযানে দোষীদের করা হয় জরিমানা। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে না। বাজারে এখনো জিম্মি হয়ে আছেন ভোক্তারা। তারা ব্যবসায়ীদের ‘হাতের পুতুল’ হয়ে আছেন।
এ অবস্থায় আজ ১৫ মার্চ বুধবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য- ‘নিরাপদ জ্বালানি, ভোক্তাবান্ধব পৃথিবী’। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলাদা বাণী দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য জনগণ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। আইনের যথাযথ প্রয়োগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে নিজের অধিকার সম্পর্কে প্রত্যেককেই সচেতন হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীল হওয়ার জন্য ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের অনুরোধ জানিয়েছেন।
১৯৬২ সালের ১৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি মার্কিন কংগ্রেসে ভোক্তাদের অধিকার নিয়ে বক্তব্য দেন। ঐতিহাসিক দিনটির স্মরণে ১৯৮৩ সাল থেকে প্রতিবছর দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে। দেশে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধে ২০০৯ সালে প্রণীত হয় ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন’।
ভোক্ত অধিকার নিশ্চিতের রূপকল্প নিয়ে একই বছর যাত্রা শুরু করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠার পর ১৪ বছর পার হলেও সংস্থাটির সক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি। জনবল স্বল্পতায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে সংস্থাটি। ভোক্তার অভিযোগ নিষ্পত্তি ও তদারকি অভিযানেই সীমাবদ্ধ রয়েছে কার্যক্রম। সেটিও পর্যাপ্ত সংখ্যায় হচ্ছে না।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংস্থাটির কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। বিগত কয়েক বছরে আগের চেয়ে ভোক্তা অধিদপ্তর অনেকখানি সক্রিয় হয়েছে। তবে কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কৌশলগত উদ্দেশ্যে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধ, অভিযোগ নিষ্পত্তি (প্রতিকার) ও সচেতনতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ থাকলেও এগুলোতে সংস্থাটি এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে।’
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার রক্ষায় একটি আইন প্রণয়ন করা হলেও আইন প্রয়োগে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়নি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ মানে কেবল অভিযোগ নিষ্পত্তি ও অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা নয়। এর পরিধি ব্যাপক। এর সঙ্গে প্রয়োজন সুশাসন, অর্থনেতিক উন্নয়ন, সুষম আয় ও সামাজিক ন্যায়বিচার।’
তিনি আরও বলেন, আইন বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক জনবল বাড়িয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করতে হবে। কোনো অভিযান পরিচালনার পর ফলোআপ করা সম্ভব হয় না। এতে জড়িতরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনটি ২০০৭-২০০৯ সালের প্রেক্ষাপটে করা হয়েছে। কিন্ত ২০২৩ সালের এসে ই-কমার্সের মতো নতুন অনেক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। ই-কমার্সে এখন হাজার হাজার অভিযোগ আসছে। সুতরাং আইনটির সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
দেশের বাজারে দেখা যাচ্ছে, অতি মুনাফা করতে বছরের নির্ধারিত সময় সিন্ডিকেটরা সক্রিয় হয়ে উঠছে। তারা ডিম, ব্রয়লার মুরগি, চিনি, পেঁয়াজ, তেল থেকে শুরু করে প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট কাটছে।
ভোক্তা অধিদপ্তরের কার্যক্রম ও সক্ষমতা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় সংস্থাটি যে তদারকি অভিযান পরিচালনা করছে, তা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। মনিটরিংয়েই বড় গলদ রয়েছে। ভোক্তা অধিকার রক্ষায় যেটা করছে, তাতে বাজারের হাতে গোনা কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কিন্তু সমস্যার গোড়ায় যারা রয়েছে, তারা পার পেয়ে যাচ্ছেন। অনুসন্ধানে বড়দের নাম উঠে এলেও কিছু করা যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘মনিটরিং মানে মিডিয়া নিয়ে অভিযান চালানো আর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা নয়। মনিটরিং হচ্ছে- আমদানিতে খরচ হলো কত, সরবরাহে বিক্রি হচ্ছে কত টাকায়, মজুদ থাকলে কী পরিমাণ রয়েছে, পণ্যটিতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার রয়েছে কিনা- এসব বিষয় মনিটরিং করতে হবে।’
ভোজ্যতেল, চিনি, আটাসহ অনেক আমদানিপণ্যে গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের বাজার জিম্মি হয়ে আছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা নেই। হাতে গোনা কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান অনেকগুলো আমদানিপণ্যের বাজার দখল করে আছে। পণ্যবাজারে যারা কারসাজি করবে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা গেলে সমস্যা অনেকখানি কমে যাবে।
ভোক্তা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিপুল জনসংখ্যার বিপরীতে তাদের জনবল অনেক কম। ঢাকাসহ প্রত্যেক জেলা কার্যালয়ে মাত্র একজন কর্মকর্তা ও একজন অফিস সহকারী রয়েছেন।
এ বিষয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের জনবল এখনো অনেক কম। বর্তমানে মোট জনবল ২১৬ জন, যার মধ্যে অফিসার আছেন ৮৫ জন। তারপরও আমরা আমাদের সর্বোচ্চটুকু দিচ্ছি। ই-কমার্স সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি করতে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এ জন্য ৬০ শতাংশ অভিযোগ নি®পত্তি করা যায়নি। তবে অন্যান্য অভিযোগের ৯৫ শতাংশ নিষ্পত্তি করতে পেরেছি।’ তিনি বলেন, জেলা পর্যায়ে জনবল দুই জন। অনেক ছোট জেলায় সেটাও নেই। পাশের জেলা থেকে গিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ছোট-বড় যেখানেই অভিযোগ পাচ্ছি- সেখানে অভিযান হচ্ছে। সেটা সবাই দেখেছে। কিন্তু বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দিলে তো আর সমাধান হবে না। এতে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু আমরা তাদের সতর্ক করেছি, তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছি, এমনকি মামলাও হয়েছে। সুতরাং বড়রা পার পেয়ে যাচ্ছে, বিষয়টি এমন নয়। তা ছাড়া অভিযানের পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন ও সুপারিশও দেওয়া হয়।
নিউজ /এমএসএম