

সাংবাদিকতার মহান পেশাকে কলঙ্কিত করা কাম্য নয় আজকাল সাংবাদিকতার পেশা হচ্ছে যেন ’হামছে বড় কৌন হ্যায়’ অবস্থা। আসলে কিন্তু তা নয়, সাংবাদিকতা হচ্ছে একটি মহান পেশা যাদের রিপোর্টের উপর নির্ভর করে একটি কমিউনিটি, একটি জাতি, একটি দেশ। তাদের বিশ্বস্থ রিপোর্টের উপর বিশ্বাস করেই জনগণ যেমন জানতে পারে তাদের আকাঙ্খিত বিভিন্ন খবরাখবর, জানতে পারে রাষ্ট্রের ভালো মন্দের খবর। জনগণের বিশ্বস্ত বন্ধু হচ্ছেন সাংবাদিক সমাজ।
বিশ্বের প্রতিটি দেশেই সাংবাদিকদের স্থান সবার উপরে। আমেরিকার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নিক্সন একবার এক প্রেস করফারেন্সে বলেছিলেন, একমাত্র সাংবাদিক ছাড়া বিশ্বের আর কাউকে ভয় করি না। সুতরাং সহজেই বুঝা যায় একজন সাংবাদিকের কলমের জোর কত ধারালো। এ জন্যই বলা হয় “পেন ইজ মাইটার দ্যান দা সোয়ার্ড”, তরবারীর চেয়েও কলম শক্তিশালী।
আজকেই এই ডিজিটাল জমানায় পদার্পন করে আমরা পেয়েছি হোয়াটসঅ্যাপ, ফেইসবুক সহ বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা যার মাধ্যমে স্বাধীন ভাবে নিজেদের মতামত জনগণের কাছে অতি সহজেই এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পৌছে দিতে পারি লেখনি এবং ভিডিও’র মাধ্যমে। সুবিধাটি সাধারণ জনগণ থেকে সাংবাদিকরাও কাজে লাগাতে পারছেন। কিন্তু এই সুবিধাটিকে অপব্যবহার করে টাকার জন্য কিছু সংখ্যক অতি লোভি মানুষ বিশেষ করে ইয়াং জেনারেশনের ছেলে মেয়েরা আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়ে সমাজকে যেমন কলুষিত করছে, ঠিক একই ভাবে সাংবাদিক নামধারী একটি গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ আদায়ের জন্য অবৈধ ভাবে টাকা রোজগারের লক্ষ্যে কাজে লাগিয়ে সৎ সাংবাদিকতার মূল্যায়ণকে কলঙ্কিত করতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে এদের দৌরাত্ম চরমে পৌঁছে গেছে।
গত ৬ মার্চ ইউকে বিডিটিভি’তে ’লাইসেন্সবিহীন টিভি চ্যানেল সহ বিভিন্ন ভুয়া অনলাইন পত্রিকার কার্ড বাণিজ্য’ শিরোনামে কয়েস আহমেদ সেলিম-এর পাঠানো প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ”রাজধানী ঢাকা সহ সারা দেশে সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে আশংকাজনক হারে বেড়েছে ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম। লাইসেন্সবিহীন ভূয়া টিভি ডিশের সঙ্গে সেট টপ বক্স বসিয়ে মূল স্যাটেলাইট টেলিভিশনের মতো টকশো, নিউজ, স্ক্রল, বিজ্ঞাপন প্রচার করছে, যা আইন পরিপন্থি।
খবরে আরও বলা হয়েছে, এসব লাইসেন্সবিহীন টিভি’র মালিকরা টাকার বিনিময়ে সারা দেশে প্রতিনিধি নিয়োগ, যানবাহনের চালকদের স্টিকার প্রদান এবং অফিসে প্রতিদিন জুয়া, মাদকের আসর বসিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। সংবাদদাতা আরও লিখেছেন, অনুসন্ধানে জানা যায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী, মাদক কারবারী, ওষুধ বিক্রেতা, সুদের ব্যবসায়ী, চালকরা রাতারাতি সাংবাদিক হয়ে দাবিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানীর অলিগলি। কোন সংবাদ লিখতে না পারলেও গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে মোটর সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কথিত এসব সাংবাদিকরা। ১ হাজার থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ডোমেইন হোষ্টিং কিনে ওয়েবসাইট খুলে ইউটিউব ও ফেসবুক খুলে পেজ তৈরী করে সেটিকে টিভি চ্যানেল অথবা নিউজ পোর্টাল হিসেবে ভুয়া প্রেস কার্ড বেচাকেনা শুরু করে। এ ধরণের কার্ড নিয়ে চাঁদাবজি, ব্ল্যাকমেইলিং এর সঙ্গে জাড়িতরাও সর্বত্র সাংবাদিক বনে যাচ্ছে। তিন বছর ধরে যেখানে সেখানে এ রকম কয়েকশ ভুয়া সাংবাদিক অবাধে বিচরন করছে। তারা নানা অনৈতিক কর্মকান্ড করে যাচ্ছে। এমন নীতিহীন কর্মকান্ডে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। গুজব ও অপপ্রচার বাড়িয়েছে।
লেখক অভিযোগ করে বলেন, তাদের এই কর্মকান্ডে পেশাদার সাংবাদিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংবাদ মাধ্যম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, আমি মনে করি, ২০১৮ সালের মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত গণমাধ্যমকর্মী আইন দ্রুত পাশ করা উচিত।
অপসাংবাদিকতা রোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্মে লিপ্ত তারা পর্য্যবেক্ষণে রয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভুয়া সাংবাদিকরা কখনই প্রশ্রয় পাবে না। (সূত্র: যুগান্তর)।
আমি যখন প্রতিদিন বাংলাদেশের খবর জানার জন্য বিভিন্ন প্রিন্ট মিডিয়া এবং অনলাইন নিউজর্প্টোালে প্রকাশিত খবরগুলো পড়ি তখনই আমার মনের মধ্যে ঘোরপাক খায় যে, ওরা কিভাবে সাংবাদিকতা করার সুযোগ পায়। তাদের লেখা খবরগুলো পড়লে দেখা যায়, একদিকে খবরের যেমন কোন ভিত্তি নেই অন্যদিকে বানানের শুদ্ধ অশুদ্ধতার কোন বালাই নেই। আজ উপরের এই সংবাদটি পড়ে নিশ্চিত হলাম বাংলাদেশে ভুয়া সাংবাদিকদের জন্ম কোথা থেকে হচ্ছে। এসব ভুয়া টিভি, অনলাইন সাংবাদিকরা শুধু যে বাংলাদেশেই আছে তা নয়, যুক্তরাজ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও তাদের প্রতিনিধি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তারা তাদের ইচ্ছামতো বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে গুজব ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে বলে অনেক অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশে যখন আমার সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে আলাপ করি তখন তারাও আমাকে বলেছেন, কিছু সাংবাদিক আছে যাদের সাংবাদিকতার কোন জ্ঞান নেই অথচ সাংবাদিকতার কার্ড গলায় ঝুলিয়ে তারা তাদের কাজ চালিয়েই যাচ্ছে, বিনিময়ে যাদের নিউজ করে তাদের থেকে বড় অংকের টাকা দাবি করে। অর্থাৎ টাকা দিলেই তাদের পক্ষে নিউজ করা হয়। টাকা নিয়ে যদি নিউজ লেখা হয় তাহলে সে নিউজ তো সে যা বলবে তাই লিখতে হবে, তাহলে নিউজের নিরপেক্ষতা রইলো কোথায়? সংক্ষেপে বলা যায়, তথাকথিত এসব সাংবাদিকদের লক্ষ্য হলো, বিনা টাকায় ব্যবসা করা!
বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, আজকের বাংলাদেশ আর গত ১৪ বছর আগের বাংলাদেশের চিত্র রাত দিন তফাৎ। বাংলাদেশের মানুষ ১৪ বছর আগে যা কল্পনা করতে পারেনি, তা আজ উন্নয়নের দিকে বাস্তবে রূপ নিয়েছে। এ সরকারের আমলে আমরা পেয়েছি পদ্মা সেতু সেই সঙ্গে এই সেতুতেই রেল লাইন স্থাপনের কাজ যা সমাপ্তির পথে, আমরা পেয়েছি চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু টানেল যা উদ্বোধনের অপেক্ষায়, রাস্তাঘাটের অকল্পনীয় উন্নয়ন। যার ফলে বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো বাংলাদেশের সাথে ব্যবসা বানিজ্য সহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা নিজেরা এসেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রধানদের সাথে দেখা করে তাদের আগ্রহের কথা জানান দিচ্ছে। তারাও চায় বাংলাদেশের এই যোগ্য নেতৃত্বকে সহযোগিতা করলে বাংলাদেশ তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে। আওয়ামী লীগ সরকারের উপর তাদের আস্থা রয়েছে। তাদের বিশ্বাস বাংলাদেশ অচিরেই বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলার গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হবে।
দেশের উন্নয়নে বাংলাদেশ বিরোধী চক্র বিরাট অংকের টাকা দিয়ে অসাধু সাংবাদিকদের ব্যবহার করে দেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের অপপ্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার কাজে নিয়োজিত করে রেখেছে, যদিও তার সুফল তারা কোন দিনই পাবে না। জনগণ এখন বুঝতে পারে কোনটি সত্য খবর আর কোনটি গুজব।
অপসাংবাদিকতা রোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্মে লিপ্ত তারা পর্য্যবেক্ষণে রয়েছে। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তথ্য ও সস্প্রচার মন্ত্রীকে বলতে চাই, বছরের পর বছর ধরে এসব সাংবাদিকদের কর্মকান্ড চলছে এ সব তথ্য তো আপনার ফাইলে জমা হওয়ার কথা। যদি জমা হয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আর অভিযোগ পাওয়ার প্রয়োজন কোথায়? এদের কর্মকান্ড বন্ধ করতে এদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করুন, দেশপ্রেমী জনগণের এটাই কাম্য।
লেখকঃ কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব