বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০২:৪২ পূর্বাহ্ন

বাংলাদেশে যেন ’বিনা মেঘে বজ্রপাত’ এর গন্ধ পাচ্ছি!

দেওয়ান ফয়সল
  • খবর আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২০ ডিসেম্বর, ২০২২
  • ২০৮ এই পর্যন্ত দেখেছেন

গত ১০ ডিসেম্বর ২০২২ বিএনপি’র গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে সারা দেশব্যাপী এক হূলস্তুল কান্ড শুরু হয়। বিএনপি কোথায় তাদের দলীয় সমাবেশ করবে, তা নিয়ে সরকারের সাথে শুরু হয় ভীষণ দর কষাকষি। দু’ পক্ষই একে অন্যকে আক্রমন করে বক্তৃতা বিবৃতি দিতে শুরু করে। ফলে দেশে জনগণের মধ্যে চরম ভয় ভীতির সঞ্চার হয়। এই সুযোগে বাংলাদেশে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত মি: পিটার হাস বিএনপি-জামায়াতের পক্ষ নিয়ে বিভিন্ন ধরণের কার্য্যকলাপ শুরু করে জনগণকে আরও ভীতির মধ্যে ফেলে দেন। তার সাথে আরও রয়েছেন ড. ইউনুস , মি. বার্গম্যান সহ অন্যান্য বাংলাদেশ বিরোধী বুদ্ধিজীবী মহলের একটি অংশ। এ সব বুদ্ধিজীবীরা পেছনে থেকে মি. পিটার হাসকে কাজে লাগিয়ে তাদের উদ্দেশ্য সাধনের চেষ্টার ত্রুটি করছেন না। সে সময় জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষে আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। তাদের সহযোগিতায়ই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞ চালায়।
১৯৭১ সালের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে আমেরিকা আমাদের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে। তারা বিশ্বে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিপক্ষে বিভিন্ন প্রোগান্ডা তুলে বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছিলো, এটা স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়, তা হচ্ছে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এ ব্যাপারে কোন দেশেরই হস্তক্ষেপ করা উচিৎ নয়। এদিকে ২৫ মার্চ রাতে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ভাষণে বলেন, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। এই ঘোষণা যখন সারা বিশ্বে প্রচার হয়ে যায়, তখন ভারত ও রাশিয়া আমদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ নেয়। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বিশ্ববাসীর কাছে আবেদন জানান, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতা করার জন্য। সে সময় অনেক দেশ মিসেস গান্ধীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। যুদ্ধ শুরু হয়, শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানী দখলদার বাহিনী মুক্তি বাহিনীর কাছে পরাস্ত হয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর যৌথ বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই আত্মসমর্পনের মাধ্যমে আমেরিকার মতো একটি বৃহৎ শক্তি বিশ্ববাসীর কাছে হেয়প্রতিপন্ন হয়। এর থেকেই আমেরিকা বাংলাদেশের উপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা তাদের উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে, জামায়াতে ইসলামী সহ বাংলাদেশ বিরোধী তথাকাথিত বুদ্ধিজীবিদের পেছনে লাখ লাখ ডলার খরচ করছে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই। তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরণের প্রেপাগান্ডা দেশব্যাপী ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তারা চায়, এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে হঠিয়ে তাদের দোসর বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় বসাতে। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নি:শেষ করে দিতে। রাষ্ট্রের মূল নীতি ধর্মনিরপেক্ষতা-কে ধ্বংস করে দিতে।
গত ১০ ডিসেম্বর বিএনপি’র মোটামোটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে তাদের সমাবেশ হয়ে গেলো। এরপর দলের নেতৃবৃন্দ ১০ দফা দাবি পূরনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। সেই সাথে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তাদের আমীর ডা: শফিুর রহামনও ঠিক একই ১০ দফা দাবি পূরনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান। হঠাৎ করে নিষিদ্ধ ঘোষিত এই জামায়েতে ইসলামী দলকে প্রকাশ্যে এসে ১০ দফা দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো যেন গণতন্ত্রকামী জনগণের কাছে বিনা বেঘে বজ্রপাতের মতো মনে হ্েচ্ছ। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণ কোনমতেই জামায়াতের প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসা মেনে নিতে পারছেন না। তাদের পেছনে কোন শক্তি কাজ করছে তা নিয়ে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। এ ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকেও কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর, সোমবার ”দি ডেইলী স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত জনাব শামসদ্দিন আহমেদের লেখা একটি আর্টিকেল পড়লাম। ১৯৭১ সালে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীতা করে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কিছু তথ্য এখানে তুলে ধরছি।
”তিনি লিখেছেন, ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছিলো, দেশ যখন হানাদার বাহিনী সুনামীর তান্ডবের মতো মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছিল, লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছিল, তখন জামায়তের ইসলামীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিলো এখানে কোন স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়নি কাজেই কোন যুদ্ধাপরাধীও নেই। দেশের জনগণ তাদের দাবি আদায়ের জন্য শুধু সংগ্রাম করছে।
তিনি লিখেছেন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর গোলাম আযমকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতিতে পুনর্বহাল করেন। সেই জিয়াউর রহমানের সময় প্রেসিডেন্ট এরশাদ সহ পরবর্তীতে যে সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা প্রত্যেকেই জামায়াতের প্রতি নমনীয় ভাব প্রকাশ করেছে। সে সময় কোন সরকারই স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি এমন কি জামায়াতের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বলেন নি।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী প্রধান গোলাম আযম পাকিস্তানে পালিয়ে যান। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর তিনি সেই গোলাম আযমকে দেশে ফিরিয়ে এনে রাজনীতিতে প্রনর্বাসিত করেন, যা ছিলো স্বাধীনতাকামী বাাংলাদেশীদের জন্য এক কলঙ্কময় অধ্যায়। ১৯৭১ সালের স্বাধীণতা বিরোধীদের যারা তাঁর মন্ত্রী সভায় ছিলেন, তাদের পরামর্শ অনুযায়ী ধর্মনিরপেক্ষতাকে সংবিধান থেকে তুলে দিয়ে ইসলামী শরিয়াহ আইন কার্য্যকর করার চেষ্টা চালানো হয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা তখন রাজনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং দল গোছানোর কাজে ছিলেন ভীষণ ব্যস্ত। এ সময় তিনি স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকেন। এ সময় বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে জামায়াতে ইসলামী সহ সকল স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে নিয়ে সরকার গঠন করেন। মূলত: বিএনপি’র সময় থেকেই জামায়াতে ইসলামী স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ পায়।
আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখন জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এই নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামী তাদের দোসর বিএনপি’র সাথে হাত মিলিয়ে কোন ঘোষণা ছাড়াই কি ভাবে আবার বাংলাদেশের রাজনীতি পুনর্বহাল হলো? এ ব্যাপারে সরকারের কি কোন কৈফিয়ত নেই, সেটাই বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী জনগণের প্রশ্ন।
বর্তমানে বাংলাদেশ যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে এগিয়ে চলছে এবং বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশ একটি রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে ঠিক এই মূহুর্তে বিএনপি, জামায়াত এবং তাদের গুরু আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের সরকার বিরোধী অপতৎপরতা এবং গুজব আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের বিরুদ্ধে আমেরিকা জামায়াতের সেই কার্য্যকলাপের কথা। আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে, এই স্বাধীনতা বিরোধী চক্র আবার এক হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে, তারা অকল্পনীয় ভাবে দেশের স্বাধীনতা ধ্বংস করার জন্য একটা কিছু ঘটাতে ত্রুটি করবেনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট যে ভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারকে নৃশংস ভাবে হত্যা করা হয়েছিলো তারই পুনরাবৃত্তি করার চেষ্টা করা হ্েচ্ছ কি না! তা-ই আমার মনে বার বার উঁকিঝুকি মারছে। এ ধরণের ঘটনা আর না ঘটুক, আল্লাহ পাকের দরবারে এই হোক আমাদের প্রার্থনা। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের প্রতি আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধীরা হচ্ছে বিষাক্ত শাপের মতো, তাদের কোন মতেই বিশ্বাস করা যায় না।

লেখকঃ দেওয়ান রফিকুল হায়দার (ফয়ছল), কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব।

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102