

পথে-ঘাটে, হাট-বাজারেসহ সর্বত্র আলোচনা একটাই কী হতে যাচ্ছে আগামী ১০ ডিসেম্বর। তাহলে কি দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের পরষ্পরবিরোধী বক্তব্যে রাজধানী ঢাকায় অনিবার্য সংঘাতের পথে ধাবিত হচ্ছে দেশ। এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে নগরে বসবাসরত কোটি মানুষের মনে। শুধু তাই নয়, জানমালের নিরপত্তা নিয়ে তাদের অনেকই ইতোমধ্যে আতঙ্কে রয়েছেন। তবে ১০ ডিসেম্বর বিএনপিকে ঠেকাতে নানা ছক কষছে টানা তিন মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা দল আওয়ামী লীগ। তবে রাজপথের বিরোধী দল হিসেবে পরিচিত বিএনপি তাদের ঘোষিত গণসমাবেশ যাতে রাজধানী ঢাকার বাইরে সরিয়ে নেয়, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সেই বিষয়ে একধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে, বিএনপি নয়াপল্টনেই তাদের গণসমাবেশ করবে। এ ক্ষেত্রে ‘সতর্ক পাহারা’র নামে আওয়ামী লীগ ঢাকাকে মোটামুটি অবরুদ্ধ করে ফেলার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।
দলীয় সূত্রমতে, গণসমাবেশ ঘিরে আওয়ামী লীগের সতর্ক পাহারা বসানোর অর্থ হলো বিএনপিকে নির্বিঘ্নে ঢাকায় সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। এমনটা হলে বিএনপির পক্ষে শান্তিপূর্ণ উপায়ে অন্যান্য বিভাগীয় গণসমাবেশের মতো ঢাকায় বড় জমায়েত করা কঠিনই হতে পারে। আর পাহারা ডিঙিয়ে বিএনপি সমাবেশ সফল করতে চাইলে সংঘাত, মারামারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তি প্রয়োগ এসব অনেকটাই অনিবার্য। আওয়ামী লীগের ভেতরে আলোচনা আছে যে বিএনপি ১০ ডিসেম্বর ঢাকার গণসমাবেশে বড় জমায়েত করতে সফল হলে পরবর্তী সময়ে আরও বড় কর্মসূচি দেবে। এমনকি পরবর্তী সময়ে সারা দেশ থেকে লোকজন এনে ঢাকা অবরোধ কিংবা অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে ঢাকার ভেতর থেকেও বড় সাড়া পাবে বিএনপি, যা সরকার পতনের বড় আন্দোলনে রূপ নিতে পারে। বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে সরকার পতনের কথা বললেও ঢাকায় তারা নিজেদের শক্তি দেখাতে পারেনি।
আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, ১০ ডিসেম্বর বিএনপির গণসমাবেশ ব্যর্থ করে দিতে পারলে পরবর্তী সময়ে আর দাঁড়াতে পারবে না। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘ঢাকা অভিযাত্রা’ কর্মসূচি দিয়েছিল বিএনপি। সেবার দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গুলশানের নিজ বাসভবন থেকেই বের হতে দেওয়া হয়নি। ওই কর্মসূচির বেশ কদিন আগে থেকেই খালেদা জিয়ার বাসভবন ঘিরে বালুর ট্রাক রেখে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল। এরপর বিএনপি আর ঢাকায় বড় জমায়েত করতে পারেনি। এসব বিবেচনায় বিএনপির জন্য রাজধানী ঢাকার গণসমাবেশ অনেকটা ‘অ্যাসিড টেস্টে’ রূপ নিয়েছে। তবে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হলো, ঢাকা নিয়ন্ত্রণে না নিতে পারলে দেশের রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায় না। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বাইরের বিভাগীয় গণসমাবেশগুলোতে বাধার মুখেও বেশ বড় জমায়েত দেখাতে পেরেছে বিএনপি। কিন্তু ঢাকায় ব্যর্থ হলে কর্মীদের মধ্যে ইতিমধ্যে যে চাঙাভাব দেখা যাচ্ছে, তাতে ভাটা পড়বে। আর আওয়ামী লীগ এটাই করতে চাইছে। এ জন্য ক্ষমতাসীন দলটি কয়েক স্তরের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিএনপি মরিয়া হয়ে আওয়ামী লীগের বাধা ঠেলে ঢাকায় বড় জমায়েত করতে চাইলে সংঘাত অনিবার্য হবে। তবে বাধার মুখে বিএনপি পেরে উঠবে না বলেই মনে করছেন ক্ষমতাসীনেরা। এ ছাড়া সংঘাত-মারামারি হলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে গণহারে মামলা ও গ্রেফতারের সুযোগ নেবে সরকার। বিএনপি দেশে ‘অশান্তি’ সৃষ্টি করতে চায়, এই প্রচারেও জোর দেবে আওয়ামী লীগ। বিএনপিকে যে সহজে ছাড় দেওয়া হবে না, এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাদের সাম্প্রতিক বক্তৃতায়। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের কদিন ধরেই বলছেন, ১০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা রাজপথে থাকবেন। বিএনপিকে শান্তি নষ্ট করার সুযোগ দেওয়া হবে না। যদি ও সর্বশেষ গতকাল রোববার পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিএনপির ১০ ডিসেম্বরের সমাবেশে সরকার কোনো বাধা দেবে না। তবে আগুন ও লাঠি নিয়ে খেলতে এলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সমুচিত জবাব দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, বিএনপি ঢাকায় কোনো ঝামেলা করলে হেফাজতে ইসলামকে মতিঝিল থেকে যেভাবে উঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এর চেয়ে কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আওয়ামী লীগ যে পরিকল্পনা নিয়েছে: এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ ১০ ডিসেম্বর কী পরিকল্পনা নিয়েছে। এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, ১০ ডিসেম্বর ক্ষমতাসীন দলটি ঢাকাকে প্রায় ‘অবরুদ্ধ’ করে রাখবে। বিএনপির অন্য বিভাগীয় সমাবেশগুলোতে বড় বাধা ছিল পরিবহন বন্ধ রাখা। ঢাকায় পরিবহণ বন্ধের বিষয়টি প্রাথমিক বাধা। মূল বাধা তৈরিতে আওয়ামী লীগ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের দক্ষিণ শাখা তাদের অধীনে থাকা ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে সতর্ক পাহারা বসানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিটি ওয়ার্ডের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা, কর্মী ও সমর্থকেরা অবস্থান নেবেন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সারোয়ার কবির বলেছেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা মেনে আমরা প্রতিটি ওয়ার্ড-থানা এলাকায় নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছি। কোথায়ও কেউ কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠিন জবাব দেওয়া হবে। ঢাকা মহানগর দক্ষিন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে সব ধরনের প্রস্তুতি ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে বলে জানান নগরের এই নেতা। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের অধীনে ৬৪টি ওয়ার্ড ও ১টি ইউনিয়ন আছে। প্রতিটিতে সতর্ক পাহারা বসানোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত। এর বাইরে উত্তরের ২৬টি থানা কমিটিও তাদের নিজ নিজ থানার নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান নেবে। ওয়ার্ড ও থানা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এতে নেতৃত্ব দেবেন। সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোও অংশ নেবে। ওয়ার্ড ও থানার অবস্থান দেখভাল করার জন্য মহানগর উত্তরের ৭৫ জন নেতাকে এলাকা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান বলেন, ১০ ডিসেম্বর তাঁরা ঢাকায় বড় একটি সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছেন। দল থেকে এখনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। সমাবেশ না হলে প্রতিটি ওয়ার্ড ও থানায় সতর্ক পাহারা বসানো হবে।
প্রস্তুতি চলছে সতর্ক পাহারার: আগামী ১০ ডিসেম্বর ঘিরে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ ‘বিএনপির মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র ও নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে’ শান্তি সমাবেশ ও মিছিল কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের প্রস্তুতির জানান দিচ্ছে। একইসঙ্গে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে প্রস্তুতি সভা করছে। গত ২৬ নভেম্বর তাদের সঙ্গে দক্ষিণ যুবলীগের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ৯ ডিসেম্বর রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ। সংগঠনের নেতারা বলছেন, এই সমাবেশে বিপুল জমায়েত নিশ্চিত করার বিষয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নির্দেশনা রয়েছে।
নিউজ/এম.এস.এম