

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ: দিন দিন দেশ উন্নত হলেও স্বাস্থ্যসেবার তেমন উন্নতি হয়নি বলেই মনে হয়। জোড়াতালি দিয়ে করোনাকাল পেরোতে পারলেও দৈনন্দিন চিকিৎসায় আমাদের ভরসা এখনো স্থানীয় সরকারি হাসপাতাল। সেখানকার স্বাস্থ্যসেবার নিম্নমান ও অপ্রতুলতার কারণে ছুটতে হয় স্থানীয় বেসরকারি ক্লিনিক বা ব্যক্তিমালিকানাধীন হাসপাতাল কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। সেখানে গিয়েও অপচিকিৎসা বা অপঘাতের মুখে পড়তে হয় মাঝে মধ্যে। কারণ রোগীকে নিয়ে হাসপাতাল-ক্লিনিকের দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের নিবন্ধন সনদ যাচাই করার মানসিকতা কারোরই থাকে না। ফলে ‘প্রসূতির পেটে কাঁচি রেখেই পেট সেলাই’ করার খবর পাওয়া যায়। ‘চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু’র খবরও আসে। ‘নার্সের ভুলে নবজাতকের হাত ছিঁড়ে যাওয়া’র মতো বীভৎস ঘটনারও মুখোমুখি হতে হয়। এ কারণে নার্স বা চিকিৎসকের ওপর হামলা ও হাসপাতাল ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটে। পত্রপত্রিকার পাতা খুললেই এমন শিরোনাম চোখে পড়ে হরহামেশাই। টেলিভিশন বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। আমরা আস্থা হারিয়ে ফেলি চিকিৎসক, নার্স ও হাসপাতালের ওপর। তবুও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আবার ছুটে যাই তাদের কাছেই।
আমাদের চারপাশে ব্যাঙের ছাতার মতো এত হাসপাতাল-ক্লিনিক গড়ে উঠেছে যে, সময় ও জীবন বাঁচাতে প্রথমত সেখানেই ছুটে যাই আমরা। তা ছাড়া ক্ষেত্রবিশেষ সরকারি হাসপাতালের একটি বেড (আসন) পেতে যে সময় ও তদবিরের প্রয়োজন হয়, তত সময় এবং ক্ষমতা সাধারণ মানুষের থাকে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগীদের সঙ্গে দুই-একজন সরকারি চিকিৎসকের দুর্ব্যবহার ও অবহেলাও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে সবাই এমন নন, ভালো চিকিৎসকও পাওয়া যায়। কয়েকটি ঘটনা কেবল দৃষ্টান্ত হয়ে থেকে যায়। এমন নানাবিধ কারণে কাছের হাসপাতাল-ক্লিনিকে ছুটে যায় মানুষ। হোক তা নিবন্ধিত কিংবা অনিবন্ধিত। অনেকাংশে সাধারণ মানুষ জানেই না যে, হাসপাতালের নিবন্ধন বলতে কিছু আছে!
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বিষয়টি জেনেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. বেলাল হোসেন জানান, ঘোষিত ৭২ ঘণ্টার অভিযানে দেশের ৮ বিভাগের ৮৮২ অনিবন্ধিত হাসপাতাল-ক্লিনিকের অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ১৬৭ (সিটি করপোরেশনসহ), চট্টগ্রামে ২২৯, রাজশাহীতে ৭৮, রংপুরে ১৪, ময়মনসিংহে ৯৬, বরিশালে ৫৯, সিলেটে ৩৫ ও খুলনায় ২০৪টি রয়েছে। অভিযানে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২টি ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত শনিবার ৭টি ও রবিবার ৫টি ক্লিনিক বন্ধ করা হয়। এর মধ্যে যাত্রাবাড়ীর ৩টি, ধানমন্ডিতে ৪টি, নাজিমউদ্দিন রোড এলাকার দুটি এবং মোহাম্মদপুর, বনানী ও বারিধারার একটি করে ক্লিনিক রয়েছে (আমাদের সময়, ৩০ মে ২০২২)।
এ তো মাত্র তিন দিনের অভিযানের খবর। সারাদেশের সব উপজেলা, ইউনিয়নের প্রতিটি হাটবাজারে গিয়ে অভিযান চালালে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আমার বিশ্বাস। করোনার পর থেকে মনে হচ্ছে, অনিবন্ধিত ক্লিনিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কারোনাকালে ব্যক্তিমালিকানাধীন অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। বাস্তবতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেকেই এবার ক্লিনিক ও ফার্মেসি ব্যবসায় নেমেছেন। তারা নিশ্চিত, কোনো মহামারীতেই এসব আর বন্ধ হবে না। তাই প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিবন্ধনের বালাই নেই। কে আসবেন খোঁজ নিতে? এসব অনিবন্ধিত হাসপাতাল-ক্লিনিকে নেই ভালো যন্ত্রপাতি, নেই ভালো টেকনিশিয়ান; ভালো চিকিৎসক তো দূরের কথা। উল্টাপাল্টা রিপোর্ট দিয়ে রোগীকে বিভ্রান্ত করে বাড়তি টাকা আদায় করাই তাদের মূল হাতিয়ার। ভুল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে জমের বাড়ি পাঠাতেও কুণ্ঠাবোধ করা হয় না, এমনকি ভুয়া চিকিৎসকের দেখাও মিলবে সেখানে। তাই সারাদেশে একযোগে অভিযান চালানো দরকার বলে মনে করি। এ অভিযান যেন অব্যাহত থাকে। গোপনে খোঁজ নিয়ে যখন-তখন অভিযান চালানো দরকার। না হলে দেশের নাগরিকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ জন্য প্রতিটি হাসপাতাল-ক্লিনিকের সম্মুখভাগে ‘নিবন্ধন সনদ’ বাঁধাই করে টাঙানো উচিত।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল শাখা জানায়, দেশে নিবন্ধিত স্বাস্থ্যসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ হাজার ৮৯৩টি। এর মধ্যে ৭ হাজার ২৬টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ৩ হাজার ৭০৫টি হাসপাতাল ও ১৬২টি ব্ল্যাডব্যাংক। তবে নিবন্ধনের বাইরে কী পরিমাণ হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে- এর কোনো হিসাব নেই। এবার তিন দিনের অভিযানে এ ধরনের ৫৩৮টি হাসপাতাল চিহ্নিত হয়েছে। অভিযান চলতে থাকলে এই সংখ্যা কয়েক হাজারে ঠেকতে পারে (আমাদের সময়, ৩০ মে ২০২২)।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অনিবন্ধিত এসব হাসপাতালের কার্যক্রম একেবারে বন্ধ না করে ধীরে ধীরে নিবন্ধনের আওতায় আনার বিষয়ে মত দিয়েছেন। মানুষকে রোগমুক্ত জীবন ও স্বাস্থ্যসেবাদানে সরকারের যাবতীয় উদ্যোগ যাতে ভেস্তে না যায়, এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের এই বিশেষ অভিযানে সাধারণ জনগণ সন্তুষ্ট। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতুল ও সহজলভ্য করতে হবে। কেননা জনগণের দাবি, চিকিৎসার নামে মানুষ হত্যার এ উৎসব যেন চিরতরে নির্মূল হয়। যারা অনিবন্ধিত আছেন, তাদের নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হোক। নিবন্ধন পাওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ শর্ত বা নিয়মাবলি পালনে যেন সমর্থ হন তারা- এদিকেও নজর দিতে হবে। যেনতেন হাসপাতাল বা ক্লিনিককে যেন নিবন্ধ না দেওয়া হয়। তবে এ জন্য সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। সময়ের এক ফোঁড় যেন অসময়ের নয় ফোঁড়ে পরিণত না হয়।
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ : কথাশিল্পী ও গণমাধ্যমকর্মী