

শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরে কারনেট সুবিধায় আনা এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকা ১০৮টি বিলাসবহুল গাড়ি ষষ্ঠবারের মতো নিলামে তুলছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
ক্লিয়ারেন্স পারমিট বা সিপি জটিলতাসহ বিভিন্ন জটিলতা নিরসন করে প্রচলিত নিলাম পদ্ধতির পাশাপাশি এবার ‘ই-অকশন’ ডাকা হয়েছে। কমানো হয়েছে গাড়ির ভিত্তিমূল্য। এ কারণে এবার এসব গাড়ির ক্রেতা পাওয়া যাবে এবং সব গাড়িই বিক্রি হয়ে যাবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
২৯ মে থেকে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট ও সরকারি নিলামকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় থেকে গাড়ির ক্যাটালগ ও টেন্ডার ফরম সংগ্রহ করা যাবে। একইভাবে ৫ থেকে ৯ জুন তারিখে অফিস চলাকালীন গাড়িগুলো চট্টগ্রাম বন্দরের অকশন শেডে সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবেন আগ্রহী নিলাম দরদাতারা। কাস্টমসের ডেপুটি কমিশনার আলী রেজা হায়দার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব তথ্য জানা গেছে।
চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম কাস্টম ছাড়াও ঢাকা কাস্টম, সিলেট কাস্টম, মোংলাবন্দর, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন অফিসসহ দেশের অন্তত ৭টি অফিসে বসানো হবে টেন্ডার বক্স। নিলাম আগ্রহীরা এসব টেন্ডার বক্সে ১২ জুন সকাল ৯টা থেকে ১৩ জুন বিকাল ৫টা পর্যন্ত টেন্ডার ফরম বা দরপত্র জমা দিতে পারবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কারনেট সুবিধার আওতায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকরা এসব গাড়ি আমদানি করেন। কারনেট হচ্ছে একটি বিশেষ পাস। যা রয়েল অটোমোবাইল কোম্পানি (ইউকে) ইস্যু করে থাকে। আর এই পাস দিয়ে একজন পর্যটক বা ভ্রমণকারী তার নিজ গাড়ি চালিয়ে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করতে পারেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় এসব গাড়ি আমদানি করেন।
কিন্তু দেখা গেছে, এসব গাড়ি শুল্কমুক্ত সুবিধায় এনে নিজে ব্যবহার না করে বরং ব্যবসায়িকভাবে দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি ও হাতবদল করা হচ্ছিল। বিষয়টি নজরে আসায় চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজ এ ধরনের গাড়ি আমদানির পর খালাসের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর আরোপ ও ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানের শর্ত জুড়ে দেয়।
এই শর্ত জুড়ে দেওয়ার পর লাভের পরিবর্তে লোকসান হওয়ায় গাড়িগুলো আর খালাস নেননি সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকরা। ১০-১২ বছর আগে এভাবে আমদানি করা ১১১টি বিলাসবহুল গাড়ি বন্দরের বিভিন্ন শেড ও কনটেইনারে পড়ে থাকে। অযত্ন-অবহেলায় পড়ে থাকতে থাকতে এসব গাড়ির বিভিন্ন পার্টস নষ্ট হয়ে যেতে থাকে।
এর মধ্যে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ বেঞ্জ, ল্যান্ডক্রুজার, লেক্সাস, রেঞ্জরোভার, মিতসুবিসি পাজেরোসহ নামিদামি ব্র্যান্ডের গাড়ি রয়েছে। যেগুলোর প্রতিটির মূল্য সর্বনিু ১ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত। গাড়িগুলো খালাস না হওয়ায় এবং বছরের পর বছর পড়ে থাকায় সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারায়।
সূত্র জানায়, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ পড়ে থাকা গাড়িগুলো ইনভেন্ট্রি, ভিত্তিমূল্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে বিগত ৬ বছরে অন্তত ৫ দফা নিলাম আহ্বান করে। প্রথম চার দফা নিলামে ‘উপযুক্ত’ দর পাওয়া যায়নি। পঞ্চম নিলামে তিনটি গাড়ির ক্রেতা পাওয়া গেলেও ১০৮টি গাড়ির ক্রেতা জোটেনি।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ক্লিয়ারেন্স পারমিট (সিপি) না থাকা, বছরের পর বছর পড়ে থেকে অনেকটা অকেজো হওয়ার পরও অতিরিক্ত ভিত্তিমূল্য নির্ধারণ, খালাস ও রেজিস্ট্রেশন জটিলতার শঙ্কা থেকে ক্রেতারা এসব গাড়ির নিলামে অংশ নেননি। আবার যারা অংশ নিয়েছেন তারা একেকটি গাড়ির দর দিয়েছেন অবিশ্বাস্য কম। এ অবস্থায় কাস্টম কর্তৃপক্ষও গাড়িগুলো নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে।
কাস্টম সূত্র জানায়, সর্বশেষ একজন অতিরিক্ত কমিশনারকে আহ্বায়ক করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, বিআরটিএর কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি ইনভেন্ট্রি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি নিলামযোগ্য গাড়িগুলো পরিদর্শন শেষে একটি রিপোর্ট পেশ করে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই প্রচলিত নিলাম পদ্ধতির পাশাপাশি ১০৮ গাড়ির ই-অকশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত হয়।
চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মো. ফখরুল আলম জানান, তারা নিজেরাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে গাড়িগুলোর সিপি বা ক্লিয়ারেন্স পারমিট সংগ্রহ করেছে। ভিত্তিমূল্যও আগের চেয়ে অন্তত ৫০ শতাংশ কম ধরা হয়েছে।
তাছাড়া গাড়িগুলো কেনার পর খালাস ও রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রেও কাস্টম বা বিআরটিএতে কোনো ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তে হবে না ক্রেতাকে। সবকিছু বিবেচনায় কাস্টম আশা করছে এবার সব গাড়ি বিক্রি হয়ে যাবে।
ইউকেবিডিটিভি/ বিডি / এমএসএম