শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:২৯ অপরাহ্ন

হৃদয় শিলা

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : শনিবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২২
  • ২৬৬ এই পর্যন্ত দেখেছেন

আজিজ ইবনে গণি: শিলা কখন এসে পাথরের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়েছে টেরই পায়নি সে। আনমনে চিঠি লিখচে বন্ধু রিপনের কাছে। এতো চুপিসারে অফিস রুমে এসে শিলা ডুকেছে। সে বুঝার কোনো শক্তিই নেই। হঠাৎ শিলার হাত থেকে বই মাটিতে পড়ে যায়। এতে শব্দ হয়। আর এই শব্দে সে সচকিত হয়। তাকায় সম্মুখে।
: আশ্চর্য। তুমি…..? আর কিছু বলতে সাহস পায় না সে। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। তার উঠে দাঁড়ানো দেখে বই ফেলেই দৌঁড় দেয় বাইরে। সে উঠে দাঁড়িয়ে ছিল যে বইটি নিজ হাতে তাকে তুলে দেবে। কিন্তু হিতে বিপরিত। শিলা তাকে ভয় পেয়ে যায়। পুরুষের সামনে তার এই প্রথম দাঁড়ানো। অর্থ প্রেম প্রেম ভাব নিয়ে পাথরেরও একই প্রথম। তার মামাতো বোন জায়োর কাছ থেকে শিলার গল্প শুনেছে। এবং তাকে ভালো লাগে এ কথাও নাকি বলেছে। তাই সেও প্রেমাগৃহেবেরিয়ে আসে বাইরে অফিস রুম থেকে। অপলক চেয়ে থাকে তার চলে যাওয়া পথ পানে। মনে মনে কষ্ট পায় এতো কাছে আসলো শিলা অথচ কিছুই বলা হয়নি। তাকে সে-ও বলেনি তবে কেন নিরর্থক আগমন? তাই তার ভেতরে কে যেন গেয়ে ওঠে-
তোমার যাবার বেলা
আমার প্রেমের কথা তুলবো না
মন যদি ভেঙ্গে যায় যায়
কিছু বলবো না…..।
শিলাও দূরে গিয়ে ফিরে তাকায় তার পানে। তার মতিগতি প্রতিক্রিয়াটা লক্ষ্য করে। দেখে এখনও সে দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। নছাতার আড়াল থেকে সংক্ষিপ্তাকারে ঠা ঠা দিয়ে গলির মোড়ে হারিয়ে যায়। সে-ও হাত উঁচু করে তাকে বিদেয় সম্ভাষণ জানায়।
আজ পাথরের আনন্দের শেষ নাই। অফিস রুমে হাতওয়ালা চেয়ারে গিয়ে বসে আয়েসে। তাকে নিয়ে ভাবতে থাকে আকাশ পাতাল। যাকে প্রতিদিন সে রাস্তায় হেঁটে যেতে দেখতো আর ছাতা তোলে তারপানে চেয়ে মৃদু হাসতো, যে জায়েদার কাছে বলেছিল, তাকে খুব পছন্দ, আজ সেই মেয়ে সশরীরে অফিসে এসে দেখা করে গেল! এ আনন্দ সে রাখবে কোথায়? এ মুহূর্তে তার পিয়াস পায় এককাপ কফির। পাশেই হোটেল স্বাদ। ডাক পাড়ে বয়কে। অর্ডার নিয়ে গেলে বয় কিছুক্ষণ পরেই কফি নিয়ে আসে। টেবিলে রেখে বলে-
: পাথর ভাই, আপনার কফি।
এতোক্ষণে পাথর অন্য জগতে। নিথর হয়ে আছে যেন। কোনো নড়াচড়া নেই। বয় মনে মনে ভাবে সে তো আমার দিকে তাকাচ্ছে, অথচ সাড়া শব্দ নেই ও কাছে গিয়ে কাঁধে হাত রাখে সাহস করে বলে-
: পাথর ভাই, আছো না কি? তোমার কফি?
: কফি? হ-হ। -বলে সে সম্বিত ফিরে পায়। ‘দে দে’- বলে হাত বাড়ায় কফির দিকে। আয়েসে মুখে পিয়াস মারে কফির কাপে। পৃথিবীর সব সুখ বুঝি এ মুহুর্তে এখানেই।
শিলা এসএসসি পরীক্ষার্থী। প্রতিদিন স্কুলে যাবার পথে ছাতাটি তোলে পাথর রায়হানকে দেখার চেষ্টা করে। ভেরাইটিজ ব্যবসা রয়েছে তার। আলাদা অফিস করে সে বসে থাকে। সম্পূর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করে কর্মচারীরা। রাস্তার ধারেই তার অফিস। ফলে শিলা যাওয়া-আসার সময় অফিসের দিকে তাকায়। পাথরের সুন্দর শুভ্র চেহারা, সিমছাম ফিগার দেখে তার খুব পছন্দ হয়েছে তাকে। ভালো লাগার কথা বাহকের মাধ্যমে তার কানেও গিয়েছে। কিন্তু পাথর তাতে পাত্তা দেয় না যদিও সব বুঝতে পারছে। আর এই ভালো লাগাতে হৃদয়ের ছোট্ট ঘরটায় স্থান করে দিয়েছে শিলা। পাথর তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। কিন্তু সে প্রতিদিন ফলো করে মেয়েটা তার অফিসের সামনে এলেই ছাতা তোলে মৃদু হাসে। এ হাসির রহস্য সে বুঝতে পারলো না বুঝার ভান করে থাকে। তার মনের ছ্টো ঘরটায় তাকেও যে স্থান করে দিয়েছে তা শিলাকে বুঝতে দেয় নি সে।
পাথর রায়হানের পাশের স্টেশনারী দোকান-ই শিলার ভাই মাহফুজের। কাষ্টমার এবং কর্মচারীদের দেখা শোনা এবং সব ধরনের ঝক্কি ঝামেলার মধ্যেও বাইরের দিকে তার চোখ আসে পাথরের দোকানের সামনেই শিলা এলে ছাতাটি তোলে তার দিকে তাকায় এবং ‘হাসে তা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছে সে। আর সেদিন তার অফিস রুমে সরাসরি আগমন তা নিজ চোখে দেখে তো জ্বলে আগুন। যদিও তাদের মধ্যে হাসি বিনিময় ছাড়া আর কিছু নেই কিন্তু মাহফুজ তা মানতে রাজি নয়। সে তারা দুজনকে নিয়ে ভাবছে আকাশ-পাতাল। যা হচ্ছে না তা-ও অবশেষে সহ্য করতে না পেরে পাথরের বড় ভাইকে একদিন দোকানে খবর দিয়ে এনে বলে-
: তোমার ভাই পাথর আমার বোনের সঙ্গে যা করছে তা সহ্য করার মত নয়।
: কি করছে?
: এখনো বলছো কি করছে? ভাই ভাইয়ের খবর রাখো না, থাকো কোথায়?
: আরে ভাই, তার সঙ্গে তো আমি সব সময় ছায়ার মত থাকতে পারবো না। কি করছে তুমি-ই বলো?
: তুমি তাকে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করো।
: আইচ্ছা ভাই, ঠিক আছে।
মাহফুজের কর্মচারী দিয়ে পাথরকে ডেকে নেয়া- হলো তার দোকানে। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো মাহফুজ যা বলছে তা কি সত্য? সব কিছু শুনে পাথর তো নিথর হতবাক। কি হচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে সে শিলার হাসা হাসি এবং সেদিন শিলার দোকানে আসা স্বীকার করেছে। আর এই স্বীকারোক্তিকে কেন্দ্র করে তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়। মাহফুজ রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা বিধায় তার কথাই সকলের কাছে গ্রাহ্য হলো এবং তাকে শাস্তি হিসাবে মাহফুজের কাছে ক্ষমা চাইতে হলো। উপস্থিত সকলের রায়কে সেদিন গুরুত্ব দিয়ে গিয়ে তাকে মাহফুজের হাত ধরে বলতে হয় এভাবে-
: ভাই সাহেব, আমাকে ক্ষমা করো, আর কোনোদিন এমন কাজ হবে না।
: যাও, ক্ষমা করে দিলাম, তুমি আমার ছোট ভাইয়ের মত ক্ষমা করবো না তো কি করবো?
সেদিন পাথর ক্ষমা চাইলেও ভেতরে তার অনেক প্রশ্ন, ঢের কষ্ট। আসলে অপরাধী কে? একটুও যাচাই-বাছাই করা হয়নি। একতরফা তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। শাস্তিও ঘাড় পেতে নিতে হয়। কিন্তু সে এর প্রতিবাদ করতে পারেনি। কারণ একটাই মাহফুজ রাজনৈতিক দলের নেতা এবং তার পিছে অনেক গুণ্ডা-পাণ্ডা আছে। ক্ষমতা না চাইলে যদি কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলে। তাহ তার চাপা কষ্ট, আর প্রশ্ন ভেতরেই ধুমড়ে কাঁদে। এদিকে শিলার কানেও ঘটনাটি গিয়ে পৌঁছেছে। কিন্তু তাকে শাসিয়ে কিছু বলেনি মাহফুজ। শুধু একদিন বলেছিল- রাস্তায় কি করো না করো সব আমি দেখি জানি। সেদিন থেকেই সে একটু সতর্ক। এ ঘটনা বিলের কার্যেরূপ নেবে তা সে ভাবতেও পারেনি। মনে মনে অনুতপ্ত হয়, পাথর অযথাই ক্ষমা চাইতে হলো। তার কি দোষ? দোষ তো আসলে আমার, তা দোকানে একদিন আমি গিয়েছি এবং তার সামনে গিয়ে আমি-ই তো হেসে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতাম। অথচ আমি বিচার কার্যের বাইরে আমাকে ডাকা হলো না কেন? একতরফা পাথরই দোষী? না, না, হয় না। কিন্তু এ কথা তার ভাইকে বলতে সাহস পায় না। তাই তার মনেও ক্রোধ আর কষ্ট জমাটবদ্ধ হয়।
প্রায় ১৫/২০ দিন চলে গেছে ঘটার। অফিস ফুলে আনমনে বারান্দায় পায়চারী করছে পাথর। দোকান থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মাহফুজ। ডাক পাড়ে তাকে। ডাক শুনে তো সে চমকে উঠে। ছৎ করে উঠে যেন বুক। এক অজানা-অচেনা ভয়ে কেঁপে ওঠে তার সমস্ত শরীর। কি জানি কি হয়। আবার কি নতুন কোনো নালিশ কেউ খাড়া করলো? ডাক শুনে ভয়ার্ত হৃদয়ে কাছে যায় তার। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে-
: ডাকলেন কেন মাহফুজ ভাই।
: কেন ডেকেছি কাছে না আসলে বলি কি করে?
পা, তার কাঁপছে, শরীরও।
যদি অজানা কোনো ভুলে কারে কাছে যেতেই চড় থাপ্পড় খেতে হয়। তাই সে কাছে না গিয়ে একটু ব্যবধান রেখে দাঁড়ায়। মাহফুজ চেয়ার থেকে উঠে তাড়িয়া থেকে একটি প্যাকেট পাথরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে-
: ওইটার ভিতরে জুতা আছে। জুতাগুলো শিলার। আমাদের বাড়িতে যাও, তাকে দিয়ে এসো।
: ঠিক আছে ভাইসাব। আর কোনো কিছু?
: না। তাড়াতাড়ি যাও। তোমার দোকান আমি দেখবো।
এবার পাথরের গলায় একটু রস হয়। গলা যেন তার শুকায় মরু সাহারা। বড় রকমের কোনো বিপদ থেকে সে বাঁচলো। কিন্তু এরপরও শেষ নয়। মনে মনে অপমানবোধ করে। এতো নীচ একটা কাজ মাহফুজ তাকে দিয়ে করিয়ে নিছে যে তার ভাবতেও কষ্ট হয়। মাহফুজের মনের জ্বালা বুঝি এখনো মেটে নি। তার বোনের জুতা বহন করিয়ে না কি সমূহ ক্রোধ মিটানোর চেষ্টা করছে। আসলে মাহফুজের মনের উদ্দেশ্যটা কি অনুধাবন করতে পারে না পাথর। কখনও ভাবে, তার বোনের সাথে মোলকাত করার জন্য কি এ সুযোগ করে দিচ্ছে। মনের কথা উজাড় করে বলার জন্য এ সুযোগ দেয়? তার জন্য বোধ হয় তার মায়া বেড়েছে। কষ্ট লেগেছে। তাই সে ভেতরে ভেতরে আনন্দবোধ করে এবং একটা রিকশা ডেকে শোধায়-
: নগরগঞ্জ চেনো?
: চিনি।
: তবে চলো।
রিকশার প্যাটেলে পা রাখে ড্রাইভার। চাপ দেয় এবং সামনের দিকে ঘুরতে থাকে তিনটা চাকা। পাথরের মনও মনের ঘরে নেই। রিকশার চাকার মত ঘুরছে যেন তারও মাথা। কি হচ্ছে সে কিছুই বুঝতে পারছে না। সে জুতা এখন সে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে সে জুতাটাই নাকি অবশেষে খেতে হয় শিলার হাতে। কি তার ভাগ্যে সে কিছুই ভেবে কুল পায় না। হঠাৎ কখন শিলার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছেছে রিকশা টেরই পায়নি। ডান হাতের চাপ ফেলে ড্রাইভারের কাঁধে। রিকশা থামায়। টাকা শোধ করে নেমে পড়ে।
দেয়াল ফিরানো বাড়ি। সামনে মনোরম গেইট। গেইটে কলিং বেল সংযুক্ত। তার হাত এগুয় কলিং বেল ধর দিকে শব্দ শুনে বেরিয়ে আসে তানরুরজ। মাহফুজের ছোট ভাই।
: আরে পাথর ভাই তুমি? আসো, আসো ভিতরে আসো।
: না, ভিতরে আর যাচ্ছি না। এগুলো শিলার। মাহফুজ ভাই দিয়েছেন।
: তা তো বুঝলাম। যার মাল তার হাতেই তুলে দেবে। আগে ভিতরে আসো তো।
নাছোবান্দা তানরুজ। পাথরের হাত ধরে টেনে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। বড় বড় করে ডাকতে থাকলো শিলাকে। সে ডাক শুনে বেরিয়ে আসে বারান্দায়। তাকে শোধায়-
: চেয়ে দেখো কে এসেছে।
শিলা চোখ তুলে তাকায় তার পানে। বুকটা যেন ছাৎ করে উঠে। ভালবাসার মানুষ আজ তার বাড়িতে। যে বিনা দোষে অপরাধী সেজে শাস্তি নিতে হয় তাকে আজ সব কিছু খুলে বলতে চায়। কিন্তু কোথায় যেন একটা বাঁধা এসে দাঁড়ায় সম্মুখে। এতো কাছে পেয়েও মন উজাড় করে কিছুই বলতে পারবে না আজ তাকে। মনে আজ খেদ তার। তার দিকে তাকাতে আজ বড়ো কষ্ট হয় তার। সমূহ যাতনা বুকে চেপে রেখে আজ তাকিয়ে-
: পাথর ভাই, তুমি এসেছো? ভাইয়ার সঙ্গে ভেতরে যাও, ড্রইং রুমে গিয়ে বসো।
: ঠিক আছে, বেশিক্ষণ বসবো না।
প্রচণ্ড গরমের দিন। ফ্যানের সুইচ অন করে তানরোজ। শিলা ভেতরে ঢুকে। ফ্রিজ থেকে আনা ঠান্ডা পানি দেয় প্রথমে। তারপর ট্রে থেকে শরবতের গ্লাস তুলে দেয় পাথরের হাতে। পাথরের ভয় এতোক্ষণে অনেকটা কেঁটে গেছে। আদর আপ্যায়নে মনের দুঃখ অনেকটা ভুলে গেছে। এবং স্বপ্ন দেখে শিলাকে নিয়ে নতুনভাবে। শরবত দিয়ে বুঝি তাদের নতুন জীবন শুরু। এতো মিষ্টি মেয়েকে সে জীবনে হারাতে চায় না। নয়া সুখানুভববে সে হারিয়ে যায় অজানায়।
টেবিলেই রাখা ছিল জুতার প্যাকেট। তানরুজের ইশারায় প্যাকেটটি নেয় শিলা। পাশের রুমে গিয়ে পাকেটটি খুলে পায়ে দেয় জুতা। মাপ মতো বসেছে পায়ে। জুতার ডিজাইনটাও ভালো। সব মিলে তার পছন্দ হয়েছে জুতা জোড়া। তাই ফিরে এসে তাকে কৃতজ্ঞতা জানায়। কষ্ট করে বাড়িতে নিয়ে আসায় অনুশোচনা করে। এবং লাজুক সুরে বলে-
: পাথর ভাই, শুনে অবশ্য খুশি হবে যে, পরশু দিন আমার বিয়ে ঠিক, তুমি আসতে ভুলবে না।
কথাটি শোনা মাত্র যেন তার পায়ের নীচ থেকে সব মাটি সরে গেছে। মনাকাশ ছেয়ে যায় কালো মেঘের ভেলায়। অনুভব করে ভয়ানক এক ঝরে পূর্বাকাশ। এ কি সত্যি শুনছে না তাকে পরখ করা হচ্ছে? কিছুক্ষণ তাকে অন্যমনস্ক দেখে শিলা আবার বলে-
: কি হলো পাথর ভাই? কথা বলছো না যে, তুমি আসবে তো?
এবার সে সজাগ হয়। কি বলবে ভেবে সে কিছু পায় না। জিহ্বার মধ্যখানে কে যেন পেরেক টুকে দিয়েছে। অনেক কষ্ট করে পেরেকটি উপড়ে তুলে তারপর বলে-
: ঠিক আছে শিলা। আসবো। তোমার এই আনন্দ ঘন মুহূর্তে আমি না এসে পারি? এখন তবে আসি।
: কিছু খেলে না যে। আমি কিন্তু পরশু অপেক্ষায় থাকবো।
: খেলাম তো।- বলে সে নির্বাক হয়ে যায়। চোখে শুধু একবার চোখ রাখে। তারপর তাকায় তানরুজের দিকে। সে অন্য টেবিলে দৈনিক পত্রিকা পড়ায় ব্যস্ত। তাদের কথাবার্তা সে লক্ষ্য করেনি পুরোপুরি। তার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে বলে-
: কষ্ট দিলাম তানরুজ ভাই।
: কষ্টের কি আছে? বরং তুমি এসেই কষ্ট করলে। এসো কিন্তু পরশু।
: অবশ্য, অবশ্য।- কথাটি বলে সে পা বাড়ায় বাইরের দিকে। তানরুজ ও শিলা তার পিছু পিছু বেরিয়ে আসে বারান্দা, পর্যন্ত। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার পানে। কিন্তু সে কষ্ট করে হলেও একবারও দেখে নেয়নি শিলাকে।
পাথর অফসে বসে আকাশ পাতাল চিন্তায় মগ্ন। মাহফুজ ভাই তাহলে এই দুঃসংবাদ নিজ কানে শোনার জন্য শিলার কাছে পাঠিয়েছিলেন? তার মাথা আরো ভারী হয়ে আসে। আরো বেশি করে অপমান বোধ করে। সমূহ স্বপ্ন তার ধুলায় মিশে যায়। নারীর কোনো সংজ্ঞা সে এ মুহূর্তে খুঁজে পায় না। নারীর হাসা আর কাঁদা, সবই কি ছলনা?
দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। অতীতের সব ভুলে গেছে পাথর। ব্যবসা নিয়ে সে এখন খুবই ব্যস্ত। নতুন আরো একটি দোকান উদ্বোধন হয়েছে। দোকানের হিসেব-নিকেশ সবই তার দেখতে হয়। এমনি এক ব্যস্ত সময়, মাগরিবের বাদ। টেবিলের ডান সাইটে মোবাইল রাখা। হিসেবের ফাঁক ফোকরে গ্রাহকের সঙ্গে কখনও কখনও সামনে বসে থাকা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলে। এমন সময় বেজে উঠলো মোবাইল সেট। হাত বাড়ালো মোবাইলের দিকে। সেটে হাত রাখার আগেই কেঁটে গেল লাইন। আবার সে নিমগ্ন হলো হিসেব-নিকেশে। বেজে উঠলো আবার। মোবাইল ধরে ওকে করার আগেই বাতাসে মিলোয় রিংটোন। বিরক্ততায় ভরে উঠে তার মন। মিসকল একটা বাজে কাজ। যে কেউ-ই এ রকম করুক না কেন, তার খারাপ লাগে। হিসাবের খাতায় আর মন বসে না। এমন সময় আবার মিসকল। এবার গোস্যা উঠে তার। কে সে? তাকে জানতে নাম্বারটিতে কল দেয়। অপর প্রান্ত থেকে মেয়েলী কণ্ঠ আসে-
: হ্যালো, আমি তোমার খুব কাছের মানুষ।
: কাছের মানুষ। কে আপনি?
: আপনি নয়, তুমি। এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে আমাকে।
: আমি যে তোমার খুব আপনজন ছিলাম।
: আমার আপন-টাপন কেউ নাই। অতীতে-বর্তমানেও। কোনোদিনও া। আচ্ছা আপনি কে? নাম কি?
: আবারও আপনি? আমাকে আগে ‘তুমি’ বলে সম্বোধন করো এবং স্মরণ করে দেখো- কণ্ঠ দিয়ে চেনা যায় কি না?
: মোবাইলে সব সময় কন্ঠ চেনা যায় না। আমি চিনতে পারছি না- নাম বলেন।
: বলবো- না। মাত্র তো দু’বছর। এর মধ্যেই ভুলে গেলে আমাকে?
: আপনাকে ভুলা, না- ভুলা এসব কিছুই আমার। তোমার নেই। তোমার আবার কে যে সারাজীবন স্মরণ রাখবো?
: আমি তোমার সব। তুমি ভুলে গেলেও আমি তোমাকে ভুলি নাই।
: ভুলার মত কাজ যদি কেউ করে তাহলে তো ভুলতে হবেই। নারীরা ছলনাময়ী কেউ যদি তাদের হাসা এবং কাঁদায় মন গলায় তাহলে জীবন শেষ। ওদের বিশ্বাস করতে নেই। প্লিজ আমি রেখে দিচ্ছি। নিজের পকেটের পয়সা নষ্ট করে এসব নষ্টামীতে আমি নেই। এরচেয়ে আপনি সোজা বলুন আপনি কে? কেন আমাকে যন্ত্রণা দেন?
: যন্ত্রণা? কিসের যন্ত্রণা?
: সবার জীবনে কম বেশি যন্ত্রণা থাকে। আমি অতীতকে ভুলে গেছি।
: আমি ভুলি নাই। এখনও আমাকে জ্বালায়-পোড়ায়।
: তুমি তাহলে…..?
: হ্যাঁ, আমি শিলা, তোমার হৃদয় শিলা।- আর কিছু বলার আগেই মোবাইলের ওপ্রান্ত অফ হয়ে যায়। সে বারবার এ নাম্বারে কল দেয়। কিন্তু সংযোগ দেয়া সম্ভব নয় বলে ঘোষণা আসে। পাথর যে অতীতকে ভুলে গিয়েছিল সে অতীত-ই আজ আবার কাছে এসেছে। কেন এসেছে? কষ্ট দিতে? অতীতের সব ঘটনা- আজ তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে শিলার মৃদু মায়াবী হাসি।

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102