

শ্রীমঙ্গলের আলোচিত স্কুলছাত্র ফাহাদ রহমান মারজান মৃত্যু রহস্য এখনো রহস্যের চাদরে আবৃত্ত রয়েছে। দুই মাস পেরিয়ে গেলেও ফাহাদের মৃত্যু রহস্য উন্মোচিত হয়নি। এ নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গাফলাতি ও আসামিপক্ষের সাথে অবৈধ সমঝোতার অভিযোগ তুলেছেন নিহত ফাহাদের পিতা মৌলভীবাজার জেলা দলিল লিখক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক মো. ফজলুর রহমান।
বুধবার সকালে শ্রীমঙ্গল শহরের ভানুগাছ রোডস্থ টি ভ্যালী রেস্টুরেন্টে এক সংবাদ সম্মেলনে ফাহাদের পিতা অভিযোগ করেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোল্লা সেলিমুজ্জামান ও অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাফিউল আলম পাটোয়ারি বাদী কর্তৃক সনাক্তকৃত দুই আসামির সাথে আর্থিক লেনদেন করে ফাহাদ হত্যার প্রকৃত সত্য জানার পরও হত্যাকাণ্ডকে অপমৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেবার জোর তৎপরতা চালাচ্ছেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মো. ফজলুর রহমান বলেন, গত ১২ অক্টোবর আমার ছেলেকে শ্রীমঙ্গল শহরতলীর শাহীবাগ আবাসিক এলাকার রেল লাইনের পাশে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ফেলে রাখে। পরে একটি মহল আমার ছেলে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে বলে অপপ্রচার চালায়। তিনি বলেন, আমার ছেলের মৃত্যুর কয়েকদিন পূর্বে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তার মায়ের নিকট ফোন করে ফাহাদকে সাবধানে চলাফেরা করার জন্য সতর্ক করেন। ওই সময় ফাহাদের এসএসসি পরীক্ষা চলছিল। মৃত্যুর দিনও তার প্র্যাকটিকেল পরীক্ষা ছিল। কিন্তু ওইদিন ভোরে আমাদের অজ্ঞাতে কে বা কারা তাকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যায়। সকাল ৯টার দিকে রেলওয়ে থানা পুলিশ ফোন করে জানান, ফাহাদ গুরুতর অসুস্থ।
সে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রয়েছে। আমরা সেখানে গিয়ে ফাহাদের রক্তাক্ত মৃতদেহ দেখতে পাই। পরে পুলিশ এ ব্যাপারে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করে। তিনি বলেন, ঘটনার পর শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে যখন ফাহাদের মরদেহ মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয় তখন রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোল্লা সেলিমুজ্জামান কম্পিউটারে প্রিন্টকৃত একটি কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলেন। ওই কাগজে লেখা ছিল ‘ফাহাদ আগের দিন থেকে নিখোঁজ রয়েছে’ এবং ‘ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে’। এসব দেখে আমি কাগজে স্বাক্ষর করিনি। ঘটনার পরপরই তদন্তের আগেই পুলিশ কিভাবে নিশ্চিত হলো আমার পুত্র ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছে।
এছাড়া আগের দিন থেকে নিখোঁজ রয়েছে মর্মে কাগজে উল্লেখ করা হলেও তা সম্পূর্ণ মিথ্যে। ফাহাদ ঘটনার দিন ভোরে বাসা থেকে বের হয়। যা শহরের বিভিন্ন সিসি ক্যামেরায় রয়েছে। ‘পুলিশ ওই গালগল্পে আমাকে স্বাক্ষর করার জন্য পীড়াপিড়ি করলেও আমি স্বাক্ষর করিনি’ বললেন নিহত ফাহাদের পিতা। ফাহাদের পিতা জানান, শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানায় দায়েরকৃত অপমৃত্যু মামলার পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোল্লা সেলিমুজ্জামান মোবাইল কল লিস্ট (সিডিআর) রিপোর্ট আসার পর তাদের ডেকে নিয়ে বলেন, সিডিআর রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন ফাহাদকে তার সহপাঠী মুন্না, টিআরজি মাহিন, রাব্বি, ডিজে ইরফান, ফুয়াদ, মান্না, মুরাদ, তানভীর, শাহরুখ, তানজিল, ইফতি, আরাফাত, সুমন, জুম্মন, জাহিদ ডনসহ আরো কয়েকজন মিলে হত্যা করেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার বর্ণনামতে, শহরের সোনা মিয়া রোডস্থ লুৎফা এলাহী কমপ্লেক্সে (এহসান করিম মঞ্জিল) খুনিরা একত্র হয়ে মাস্টার প্ল্যান করে ফাহাদকে হত্যার পরিকল্পনা করে।
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসার পর অপমৃত্যু মামলাকে হত্যা মামলায় রূপান্তর করে সব আসামিদের ধরে প্রকৃত রহস্য উৎঘাটন করা হবে। কিন্তু ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসার পর ফাহাদের পরিবারের সদস্যরা রেলওয়ে থানায় যোগাযোগ করলে রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী ও তদন্ত কর্মকর্তা মোল্লা সেলিমুজ্জামান ট্রেনের আঘাতে ফাহাদের মৃত্যু হয়েছে বলে অপমৃত্যু মামলার ফাইনাল প্রতিবেদন দেবেন বলে তাদের বলেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে মাথায় আঘাত জনিত ও মস্তিষ্কে রক্ত জমাটের কারণে মৃত্যু হয় এবং কপালে দুটি ও পায়ের নিচে আঘাতের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তদন্তকারী কর্মকর্তা মাথায় আঘাতটি ট্রেনের আঘাত বলেই দাবি করছেন। তবে অভিজ্ঞদের অভিমত ট্রেনে আঘাত লাগলে লম্বা কাটা দাগ হবার কথা নয়, মাথা চূর্ণ বিচূর্ণ হবার কথা। এছাড়া যে ট্রেনে ফাহাদ কাটা পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে সে ট্রেনের চালক জাহিদুল ইসলাম বলেন, যেখানে ঘটনাস্থল উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে ট্রেনে কাটা পড়া বা ট্রেনের ধাক্কা এ ধরণের কোন ঘটনাই ঘটেনি। সেদিন তিনি আখাউড়া থেকে সিলেট পর্যন্ত ট্রেনে চালকের দায়িত্ব পালন করেন। ওই রুটে ট্রেনে কাটা বা ট্রেনে ধাক্কা লাগার কোন ঘটনা ঘটেনি।
ফাহাদের পিতার অভিযোগ, মোবাইল কল লিস্ট (সিডিআর) রির্পোট আসার পর এ হত্যার ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রেলওয়ে থানার ওসি সন্দেহভাজন আসামিদের সাথে যোগসাজস করে আর্থিক লেনদেন করেছেন। এছাড়া তদন্ত কর্মকর্তা এসব সিডিআর সংগ্রহের নাম করে নিহত ফাহাদের পরিবারের নিকট থেকে ২২ হাজার টাকা নিয়েছেন। তারপরও অজ্ঞাত কারণে ফাহাদ হত্যাকাণ্ডকে অপমৃত্যু হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে। মামলার তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টার কারণে ফাহাদের পিতা তদন্ত কর্মকর্তা ও শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার ওসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া এবং তাদের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে মামলার এ মৃত্যু রহস্য উদঘাটনের মামলার তদন্তভার পিবিআই, সিআইডি বা র্যাবের মতো সংস্থার কাছে হস্তান্তরের দাবি জানান।
তার দাবি হত্যাকাণ্ডের সকল প্রমাণ শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানা পুলিশের কাছে পরিবারের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা হলেও তারা তদন্তের নামে সময়ক্ষেপন ও মামলার আলামত নষ্ট করে আসামিদের বাঁচানোর পায়তারা করছেন। তিনি তার সন্তান হত্যার রহস্য উদঘাটন করে খুনিদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশের আইজিপিসহ সংশ্লিষ্ট সকলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোল্লা সেলিমুজ্জামান মুঠোফোনে ‘মামলার তদন্ত চলছে-বলেই ফোনের লাইন কেটে দেন।
শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাফিউল ইসলাম পাটোয়ারীর সাথে কথা বলতে অফিসিয়্যাল মুঠোফোনে ফোন করলে তা রিসিভ করেন থানার উপ-পরিদর্শক সাব্বির। তিনি জানান, তিনি (ওসি) বাইরে অভিযানে রয়েছেন।
রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র গণমাধ্যমকর্মীদের মুঠোফোনে জানান, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি খোঁজ নিয়ে সিলেট জোনের এসপিকে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বলবেন। সংবাদ সম্মেলনে নিহত ফাহাদের ছোট ভাই ফারদিন রহমান, মো.সালমান, ছোট বোন নুসরাত জাহান জেনিফা, চাচা মো. ইমাদ আলী ও সমাজসেবক মুসাব্বির আল মাসুদ উপস্থিত ছিলেন।