

রফিকুল হায়দারঃ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্প্রতি বিএনপি সারা দেশে এক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা শুরু করেছে। তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, ক্ষমতায় যখন তারা যেতে পারবেনা তখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে নির্বাচনকে বানচাল করা।
বিএনপিকে সব সময়ই দেখা গেছে তারা অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার করতে চায়। নিজের শক্তি না থাকলে যে অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার করা যায় না তা তারা এখনও বুঝতে পারেনি এটাই বড় দু:খ। এত বড় একটা রাজনৈতিক দল হয়েও তারা’ ফকির যে ভাবে ভিক্ষার জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায় একমুঠো অন্নের জন্য’, ঠিক তেমনি বিএনপিকেও দেখা যায় রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ছোট বড় রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের পক্ষে কাজ করার জন্য অনুনয় বিনয় করছে, তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছে। তাদের সাথে গোপনে বৈঠক করছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিএনপি যেন তাদের দলকে রাজনৈতিক ভাবে ভুলুন্ঠিত করতে চলেছে!
একটা রাজনৈতিক দলের জন্য জনগণের কাছে তা যে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা তা কি নেতৃবৃন্দ বুঝতে পারেন না? তারা যখন বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় ছিলো তখন জ্বালাও, পোড়াও, হত্যা-গুম, জনমালের নিরাপত্তা নেই, দেশ চালানোর এ অবস্থা দেখে তখনই বাংলাদেশের জনগণ তাদেরকে প্রত্যাখান করেছে।
গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ইউকেবিডি টিভি ডট কম নিউজ পোর্টালের এক খবরে পড়লাম, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল হানিফ বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত উসকানি দিচ্ছে, পায়ে পা দিয়ে গন্ডগোল করার চেষ্টা করছে। তারা আবার নতুন করে রাজপথে নেমেছে। সভা সমাবেশের নামে তান্ডব চালাচ্ছে। তাদের ষড়যন্ত্র শেষ হয়ে যায়নি। এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
এর আগে অন্য এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিছিল মিটিং করা একটি রাজনৈতিক দলের গণতান্ত্রিক অধিকার। শান্তিপূর্ণ ভাবে তারা তা করলে যেন কোন বাধা দেয়া না হয়। তবে যদি ভাঙচুর, লুঠপাট, অগ্নিসংযোগ করে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি করে, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
বর্তমানে বিএনপি’র আন্দোলন দেখে মনে হচ্ছে, যদি তারা গন্ডগোল সৃষ্টি না করে তা হলে সরকার কোন একশন নেবে না এবং কার্য্যও সিদ্ধি হবে না। সুতরাং এমন ভাবে আন্দোলন করতে হবে যাতে আ্ইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের উপর চড়াও হয়। এই বুদ্ধিটা অবশ্য বিএনপি’র নয় এটা হচ্ছে জামায়তের দেয়া বুদ্ধি!
একটি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেছে, বিএনপি-জামায়াতের গোপন পরামর্শ হচ্ছে, গোপন বৈঠকে তারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন এবং কর্মসূচী প্রণয়ন করছেন। কর্মসূচীগুলোর লক্ষ্য হলো ভাঙচুর এবং জনগণের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করা। এক ধরণের নাশকতামূলক এই কর্মসূচীর ব্যপ্তি হবে ১০ থেকে ১৫ মিনিটের। এই সময়ের মধ্যে ব্যস্ত সড়কে, ব্যস্ত জনপদে জামায়তের ক্যাডাররা ভাঙচুর এবং ত্রাস সৃষ্টি করে চলে যাবে। এই কর্মসূচীর লক্ষ্য হলো তিনটি। প্রথম লক্ষ্য হলো, জনগণের মধ্যে আতঙ্ক তৈরী করা। এজন্য বিএনপি’কে সহায়তা করার জন্য জামায়াত এই ঝটিকা কর্মসূচী নিয়ে মাঠে নামছে। জামায়তের বিভিন্ন এলাকাগুলো থেকে ২৫ থেকে ৩০ জন ক্যাডার একত্রিত হবে এবং আকস্মিক ভাবে একটি তান্ডব করে যে যেখানে পারে পালিয়ে যাবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, এই কর্মসূচীর মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে একটা বার্তা দেয়া এবং তৃতীয় লক্ষ্য হলো, সরকারকে বিচলিত করা।
বর্তমানে ঢাকা সহ অন্যান্য জায়গায় বিএনপি যে ভাবে তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছে, সভা সমাবেশের নামে তান্ডব চালিয়ে যাচ্ছে এ যেন বিএনপি-জামায়তের গোপন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেরই বহি:প্রকাশ।
এছাড়াও এখন জাতীয় পার্টি বর্তমানে দু’দলে বিভক্ত। একটি হলো রওশন এরশাদের দল, অন্যটি হলো জিএম কাদেরের দল। রওশন এরশাদ কোন সময়ই দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পক্ষে নন, তিনি পার্লামেন্টে বিরোধী দলীয় নেত্রী। তাঁর লক্ষ্য হলো দেশ যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে গেছে, তাহলে দেশকে আরও এগিয়ে যেতে দাও। কিন্তু জি এম কাদের এই প্রস্তাবে রাজী নন। তার কারণ হচ্ছে, তিনি বড় ধরণের টেপ পেয়েছেন ড. ই্উনুসের কাছ থেকে।
জানা গেছে, জাতীয় পার্টির নেতা জিএম কাদের এখন সুশীল সমাজের একজন প্রিয়ভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন। সুশীল সমাজের সঙ্গে তার এখন যোগাযোগের ঘনিষ্ঠতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে, ড. মোহাম্মদ ইউনুসের পরামর্শক্রমেই জিএম কাদের বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং সরকারের সমালোচনা করছেন। তিনি বর্তমানে রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্র, কুটনীতি ইত্যাদি সব বিষয় নিয়েই কথা বলছেন।
এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির যখন টালমাটাল অবস্থা তখন থেকেই তিনি ড: ইউনুসের নজরে পড়েন এবং তাঁকে নিয়ে পরিকল্পনা আাঁটেন। কারণ, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, বিএনপি নানা কারণেই শেষ পর্য্যন্ত আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে গ্রহণযোগ্য হবেনা। তা ছাড়া বিএনপি’র শীর্ষ দুই নেতা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত। এ রকম পরিস্থিতিতে জিএম কাদেরের মতো ব্যক্তিকে তার পছন্দ হয়েছিলো। সুশীলরাও নানা কারণে জিএম কাদেরকে পছন্দ করছেন। তারা মনে করছেন, যদি পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে হঠাতে হয় তাহলে সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর এই ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব একটি প্রধান বিষয়। এই মূহুর্তে শেখ হাসিনার কোন বিকল্প নেই। আর এ কারণেই ড. ইউনুস মনে করছেন যে, শেখ হাসিনার বিকল্প না হোক অন্তত: একজন স্বচ্ছ ইমেজের ব্যক্তি হিসেবে জিএম কাদেরকে সামনে আ্নলে কিছুটা কাজ হতে পারে।
ড. ইউনুসের ধারণা থেকে বুঝা যায় যে, তিনি বিএনপি’কে তাঁর ডায়েরী থেকে নাম কেটে দিয়েছেন (আসলে তা হচ্ছে লোক দেখানো)। গত নির্বাচনেও ড. ইউনুস বিএনপি, গণফোরাম সহ অন্যান্য দলকে জড়ো করে গণফোরাম নেতা ড. কামাল হোসেনকে নেতা বানিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নির্বাচন করে একদিকে যেমন ড. কামাল হোসেনের মতো একজন বিজ্ঞ লোক এবং ছাত্রলীগের সাবেক ভিপি জননন্দিত সুলতান মোহাম্মদ মনসুরকে নির্বাচনে হেরে জনগণের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করেছিলেন, ঠিক সে ভাবে আগামী নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি নেতা জিএম কাদেরকে একই অবস্থায় ফেলেন কি না তা-ই এখন দেখার বিষয়।
মূলত: ড. ইউনুসের মূল লক্ষ্য হলো, বিএনপি’কে আড়ালে রেখে জিএম কাদেরকে সামনে এনে আগামী সাধারণ নির্বাচনে দাঁড় করানো। যদিও তিনি জানেন যে তা কোন মতেই সম্ভব নয়, তবুও স্বপ্ন দেখতে অসুবিধা কি? যদি ভাগ্যক্রমে জিএম কাদের জিতে যান তাহলে তো বিএনপি তাঁর হাতেই আছে। তখন কাদের সাহেবকে একটা মন্ত্রী বানিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসিয়ে নিজের ব্যবসাটা আবার চাঙ্গা করে ফেলবেন!
অন্যদিকে, সম্প্রতি বিএনপি নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং কুটনীতিকদের সঙ্গে দেখা করে তাদের অবস্থান বর্ণনা করেছেন। জানা গেছে, বিএনপি নেতৃবৃন্দকে রাষ্ট্রদূতরা সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের একটি রূপরেখা খুঁজে বের করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গেছে, ও্ই বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন তদের মধ্যে রয়েছেন, ব্রিটিশ হাই কমিশনার রবার্ট ডিকসন, জার্মান রাষ্ট্রদূত আখিম ট্র্যোস্টার, জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি, ই্উরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিনিধি, সুইজারল্যান্ড ও ডেনমার্ক দূতাবাসের প্রতিনিধিরা। এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের সাথে তার গুলশানের বাসায়। এখন দেখা যাক কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
লেখকঃ দেওয়ান রফিকুল হায়দার (ফয়ছল) সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট, সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব