শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬, ০৪:৪৯ অপরাহ্ন

অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শণ

সংবাদদাতার নাম :
  • খবর আপডেট সময় : বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট, ২০২২
  • ৪৫৭ এই পর্যন্ত দেখেছেন

ড. প্রশান্ত কুমার রায়: বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে কোন বই বলা যাবেনা কারণ এটি কোন লেখক রচনা করেননি। এটি বঙ্গবন্ধু তাঁর আজীবন সংগ্রামের ইতিহাস লিখে রেখে গেছেন। অনবদ্য ও অনন্য এ জীবন ইতিহাস রচনার পেছনে যে মহিয়সী নারীর অবদান সবচেয়ে বেশী আমি গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরন করছি বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য পত্মী বেগম ফজিলাতুনেছা মুজিবকে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, বাঙ্গালি জাতির জন্য গভীর মমত্ব, স্বাধীন মাতৃভূমির জন্য তাঁর যে সীমাহীন ত্যাগ ও অবদান তা কোনকিছুর সাথে, কোন ব্যক্তি বা কোন নেতার সাথে তুলনা করার বিষয়টি একেবারেই প্রশ্নাতীত। আর এবইটিকে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে এক অবর্নণীয় অনুপ্রেরণাদায়ী শক্তিশালী একটি দলিল। আমি দৃড়ভাবে বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেই নিহিত আছে বাংলাদেশের অসমাপ্ত যুদ্ধের ঐন্দ্র্রজালিক সেই শক্তি যা একটি পথভ্রষ্ট জাতিকে সঠিক গন্তব্যে পৌছে দিতে পারে। বইটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমি দেখি বঙ্গবন্ধু কখনো মানবতার দূত, কখনো রাজনৈতক গুরু ও পথ প্রদর্শক, কখনো অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক ও বাহক। কখনো বঞ্চনা ও প্রতারণার বিরুদ্ধে সোচ্চার এক বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, রাজনীতিতে ধোকা বা গোপনীয়তা ও কোটারী স্বার্থবাদিতার বিরুদ্ধে আপোষহীন যোদ্ধা। তাঁর আত্মজীবনী এত বেশী বৈচিত্রে ভরপুর তা আমাদের মত ক্ষুদে লেখকের পক্ষে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাঁর জীবনের ঝুকিপূর্ণ কাহিনীগুলো এবং বাস্তব জীবনের দুঃসাহসিক ঘটনাগুলো ছোটবেলার বাহরাম সিরিজ ও কুয়াশা সিরিজের লোহমর্ষক কাহিনীকেও হার মানায়। দুঃখ কোথায় জানেন? আমরা বঙ্গবন্ধুর জীবন কাহিনী কতজনে পড়ব অথবা যারা পড়ব বা পড়েছি তারা কি আদৌ অনুসরন করব বা করছি? আমরা কি তাঁর আদর্শবাদী জীবন সংগ্রাম থেকে কিছু শিখব? কে কি করবে জানিনা। তবে এটি একটি অসম্ভব রকমের জাদুকরী বাস্তব দলিল যা মানুষকে দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ হতে উদ্বুদ্ধ করবে- অবশ্যই সে ভবিষ্যত আমরা দেখতে পাব। এ সকল আকাঙ্খা নিয়ে কোন ভুলত্রুটির জন্য পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবনের কিছু কিছু প্রসংগ তুলে ধরার চেষ্টা করলাম।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ভূমিকায় লেখা একটি প্যারায় বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ, গরীব ও দুঃখী মানুষের জন্য এ মহামানরেব গভীর অনুভূতি- এ সকলই মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে এক মহান ব্যক্তিত্বকে খুজে পাওয়া যায় বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। জননেত্রী শেখহাসিনা এই অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে অনুসরন করে বা এ লেখার সুত্র ধরে গবেষণা করলে অনেক বেশী অজানা তথ্য জানা যাবে বলেও মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর উক্তিটি সকলের জ্ঞাতার্থে তুলে ধরছি। তিনি বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘দেশের জন্য, মানুষের জন্য, একজন মানুষ কিভাবে কতখানি ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, জীবনের ঝুকি নিতে পারেন, জেল জুলুম নির্যাতন সহ্য করতে পারেন তা জানা যায়। জীবনের সুখ-স্বস্তি, আরাম, আয়েশ, মোহ, ধন-দৌলত, সবকিছু ত্যাগ করার এক মহান ব্যক্তিত্বকে খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু সাধারণ গরীব দুঃখী মানুষের কল্যাণের জন্য কিভাবে তিনি নিজের সব চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিয়েছেন তা একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে অনুধাবন করা যাবে।” এখানে আরেকটি কথা বলা প্রাসঙ্গিক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যারও গরীব শ্রেণী ও সমগ্র দেশবাসীর প্রতি গভীর মমত্ব ফুটে উঠেছে। তিনি বলেছেন “বাংলার মানুষ এখনও বড় কষ্টে আছে। আগামী প্রজন্ম এই লেখা পড়ে অনুপ্রানিত হয়ে দেশসেবায় ব্রতী হবে সে প্রত্যাশা রাখছি।” বঙ্গবন্ধু শুধু বাঙ্গালীর অকৃত্রিম বন্ধুই ছিলেন না তিনি ছিলেন একজন মহাজ্ঞানী, দার্শনিক এবং সর্বোপরি মহামানব। তাঁর উদারতা ও মানব প্রেম ছিল আকাশচুম্বি। তিনি জীবনের সিংহভাগ সময় জেল জুলুম অত্যাচার সহ্য করেছেন। যাঁর নেতৃত্বে একটি জাতি দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছে, তিনি কতটা মহান হলে কতটা বিনয়ী হলে তাঁর নিজ অবদানকে অহমিকা না করে বলেছেন। “আমার জীবনের ঘটনাগুলি জেনে জনসাধারণের কি কোন কাজে লাগবে? কিছুই তো করতে পারলাম না। শুধু এইটুকু বলতে পারি, নীতি ও আদর্শের জন্য সামান্য একটু ত্যাগ স্বীকার করতে চেষ্টা করেছি।” আসলেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লেখা মন্তব্য ও বঙ্গবন্ধুর জীবনাদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি অুনকরণীয় মাইলফলক হয়ে রইবে।
বঙ্গবন্ধুর জীবনে প্রায় দু’যুগই কেটেছে জেল-হাজত ও অন্তরীণ অবস্থায়। প্রথমত হাজতে ও জেলে কেটেছে সাধারণ কয়েদিদের সাথে। জেলে সেকি অবর্ণণীয় দু:খময় জীবন। কখনো কখনো অসুস্থ হয়ে পড়তেন, খাবার খেতে পারতেন না। অসুস্থ অবস্থায় এত ক্ষীণ হয়ে গেছেন যে কথাও জড়িয়ে আসছে। এসকল দিকে তিনি ভ্রুক্ষেপ করতেন না। সহযোদ্ধাদের সাথে শুধু একটাই আলোচনা- দেশের মানুষের মুক্তি হবে কি করে। বঙ্গবন্ধুর প্রথম জেল ছাত্র-জীবনে। ১৯৩৮ সালে মুসলীমলীগ ও হিন্দু মহাসভার দ্বন্দের কারনে বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদ করায় হিন্দু মহাসভার পক্ষ থেকে থানায় একটি মিথ্যা মামলা দায়ের করে এবং বঙ্গবন্ধুসহ বেশ কয়েকজনকে কারাবরণ করতে হয়।
১৯৪৩ সালে দেশে অবর্ণনীয় দুর্ভিক্ষ হয় এবং লক্ষ লক্ষ লোক মারা যায়- সেই মর্মন্তুদ কাহিনীও বঙ্গবন্ধু আত্মজীবনীতে লিখে রেখে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর কলমে প্রতিবাদী কন্ঠে ফুটে উঠেছে “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যখন বাংলাদেশ দখল করে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায়, তখন বাংলায় এত সম্পদ ছিল যে, একজন মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী গোটা বিলাত শহর কিনতে পারত। সেই বাংলাদেশের এই দুরবস্থা চোখে দেখেছি যে, মা মরে পড়ে আছে, ছোট বাচ্ছা সেই মরা মার দুধ চাটছে। কুকুর ও মানুষ একসাথে ডাস্টবিন থেকে কিছু খাবার জন্য কাড়াকাড়ি করছে। ছেলেমেয়েদের রাস্তায় ফেলে দিয়ে মা কোথায় পালিয়ে গেছে। পেটের দায়ে নিজের ছেলেমেয়েকে বিক্রি করতে চেষ্টা করছে। কেউ কিনতেও রাজি হয় নাই। বাড়ির দুয়ারে এসে চিৎকার করছে, ‘মা বাচাও, কিছু খেতে দাও মরে তো গেলাম, আর পারি না, একটু ফেন দাও।’ এই কথা বলতে বলতে ঐ বাড়ির দুয়ারের কাছেই পড়ে মরে গেছে। আমরা কি করব? হোস্টেলে যা বাঁচে দুপুরে ও রাতে বুভুক্ষুদের বসিয়ে ভাগ করে দেই, কিন্তু কি হবে এতে?”(১৮ পৃষ্ঠা) বঙ্গবন্ধুর পিতা অর্থাৎ আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দাদা ছিলেন একজন বিদ¦ান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। জীবনে মানুষ কি করে বড় হয় এবং কোন কাজে বিফল হয় না তাঁর একটি উপদেশ তিনি বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছিলেন। বিষয়টি ছিল বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। পরীক্ষা সামনে কিন্তু পড়ার সময় কোথায়! রাতদিন দুর্ভিক্ষ নীপিড়িত মানুষের জন্য কাজ করেছন। এমন সময় একদিন বঙ্গবন্ধুর পিতা মরহুম শেখ লুৎফর রহমান সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বললেন “বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ, Sincerity of purpose and honesty of purpose’ থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।” (২১ পৃষ্ঠা)
বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ, দুঃসাহস এবং বিপদ-আপদই বলি সবই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও ভয়াবহ। একবার তখন তিনি ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র। অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সম্মেলন হয়েছিল দিল্লীতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন সঙ্গে ছিলেন ইসলামিয়া কলেজের সেক্রেটারী মীর আশরাফ উদ্দিন। তিন দিন পর বঙ্গবন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়েন। লক্ষ লক্ষ লোকের সম্মেলন সবাই তাবুতে থাকেন। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তখনকার দিল্লী একেবারেই অচেনা, কোথায় ডাক্তার, কোথায় টাকা, কে সাহায্য করবে। এমনই অসহায়ত্বের মধ্যে নির্বিকার রইলেন বঙ্গবন্ধু। আল্লাহ্তালার অসীম রহমত খলিল সাহেব আলীয়া মাদ্রসা থেকে পাস করে হেকিমী পড়তে দিল্লী এসেছেন- তিনি হঠাৎ করে ক্যাম্পে এসে বঙ্গবন্ধুর কাছে এলেন। এসেই তিনি হতবাক। অবস্থা গুরুতর দেখে নিজেই ডাক্তার আনতে যান এবং বঙ্গবন্ধুর চিকিৎসার ব্যবস্থা হয় এবং জীবন রক্ষা পায়।
অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখাযায় বঙ্গবন্ধু বলছেন “পাকিস্তান দুইটা হবে, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে। একটা বাংলা ও আসাম নিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র; আর একটা ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হবে- পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সীমান্ত ও সিন্ধু প্রদেশ নিয়ে এবং অন্যটা হবে হিন্দুস্তান। ওখানে হিন্দুরাই সংখ্যাগুরু থাকবে তবে সমান নাগরিক অধিকার পাবে হিন্দুস্তানের মুসলমানরাও।” অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ন্যায়সংগত ভিত্তি নিয়েই সেদিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন। (২২ পৃষ্ঠা)
সংগঠনের মধ্যে কোটারীকে তিনি খুব ঘৃণার চোখে দেখতেন। একবার তিনি কোটারী সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবের প্রস্তাবে ভেটো দেন। তখন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব রেগে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে কটু কথা বলেন এবং বঙ্গবন্ধুও তার প্রতিবাদ করেন এবং সভাস্থল ত্যাগ করেন। ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দাড়ানোর জন্য অন্যরা অনেকেই তখন বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন করলেন। অবস্থা বেগতিক বুঝে জনাব হুদা সাহেবকে পাঠিয়ে শহীদ সাহেব বঙ্গবন্ধুকে অনুরোধ উপরোধ করে ফিরিয়ে আনেন। যুগে যুগে রাজনীতিতে দলীয়করণ, নিজস্ব আত্মীয় ও পছন্দের লোকদের পদ-পদবীর সুযোগ করে দেয়ার চিত্রও তিনি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন “খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেবের নেতৃত্বে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে ঢাকার এক খাজা বংশের থেকেই এগারোজন এমএলএ হয়েছিল। ১৯৪৩ সালে, খাজা নাজিমুদ্দিন সাহেব যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি তাঁর ছোট ভাই খাজা সাহাবুদ্দিন সাহেবকে শিল্পমন্ত্রী করলেন। আমরা বাধা দিলাম, তিনি শুনলেন না। শহীদ সাহেবের কাছে আমরা যেয়ে প্রতিবাদ করলাম, তিনিও কিছু বললেন না”। (পৃষ্ঠা-১৭) এ সব শুনে সকলে অবাক হবেন। কারণ, এখনতো শুধু জি হুজুরের জয় জয়কার- এমন দৃঢ়তা ও সৎ সাহস আছে ক’জনার?
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শের এক কানাকড়িও আমরা আজ অনুসরন করতে পারিনা। তিনি তখনও বিশ্বাস করতেন বা জানতেন না যে, তৎকালীন এম এল এরাও টাকা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে ভোট দেয়। একজন এম এল এর কথা, “আমাকে বাইরে যেতে দিন, কোন ভয় নাই। বিরোধী দল টাকা দিতেছে, যদি কিছু টাকা নিয়ে আসতে পারি আপনাদের ক্ষতি কি? ভোট আমি মুসলিম লীগের পক্ষেই দিব।” বঙ্গবন্ধু তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বলেছেন, “আশ্চর্য হয়ে চেয়ে রইলাম তাঁর দিকে। বৃদ্ধ লোক, সুন্দর চেহারা, লেখাপড়া কিছু জানেন, কেমন করে এই কথা বলতে পারলেন আমাদের কাছে? টাকা নিবেন এক দল থেকে অন্য দলের সভ্য হয়ে, আবার টাকা এনে ভোটও দিবেন না। কতটা অধঃপতন হতে পারে আমাদের সমাজের! এই ভদ্রলোককে একবার রাস্তা থেকে আমাদের ধরে আনতে হয়েছিল। শুধু সুযোগ খুজছিলেন কেমন করে অন্য দলের কাছে যাবেন।” (২৯ পৃষ্ঠা)
বঙ্গবন্ধু দলের জন্য যারপর নেই পরিশ্রম করতেন, কাজ করতে করতে অনেক সময় অনাহারেও থেকেছেন। একবার শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবের কথায় কোলকাতা থেকে রংপুর এলেন এক এম এল এ সাহেবকে পার্লামেন্টে নিয়ে যেতে। একদিন একরাত না খেয়ে ছিলেন- শুধু ঐ এম এল এ সাহেবের বাড়িতে রাত ২.০০ টায় এক গ্লাস পানি চেয়ে খেয়েছিলেন (৩৪ পৃষ্ঠা)। এটা থেকে আমাদের ন্যূনতম কিছু শেখা উচিত- জনগণের জন্য রাজনীতিবিদদের ত্যাগ ও আর্দশ থাকতে হয়- টাকা দিয়ে মনোনয়ন ও টাকা ছড়িয়ে ভোট কেনার রাজনীতি তিনি একেবারেই অপছন্দ করতেন। দুর্ভাগ্য তাঁরই শ্রম, মেধা, ত্যাগ, সংগ্রামের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ এবং এ দেশের মানুষের জন্য তিনি জীবনও বিসর্জন দিয়েছেন। দিয়েছেন সপরিবারে আত্মাহুতি। সে দেশে আজ তাঁরই অত্যন্ত অপছন্দের রাজনৈতিক চর্চা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অতি সত্য কথন ভাল নয়। তারপরও বলি, যতদ্রুত সম্ভব এ অপচর্চা ও দুর্বৃত্তায়নের অবসান হওয়া উচিত। না হলে বঙ্গবন্ধুসহ ৩০ লক্ষ শহিদের আত্মত্যাগ বিফলে যেতে পারে।
ক্ষমতার পালাবদলে ধনী ও সুবিধাবাদী শ্রেণী সবসময়েই নিজেদের জায়গা দখল করে নেয়- এ সত্যটিও বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, টাকায় কেনা-বেচা হয়, ক্ষমতার লোভে তোশামুদি ও নীতি বিসর্জন দেয়- এমন নেতাদের দিয়ে সেদিন স্বাধীনতা ও পাকিস্তান কায়েম সম্ভব ছিল না। কারন, তারা ছিল বৃটিশ কতৃক খেতাবধারী ও জমিদার জোতদারদের দালাল। বরং শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবদের ন্যায় নেতা, বাংলার যুব সমাজ, ছাত্র সমাজ সাধারণ মানুষের কাছে মুসলিম লীগকে জনপ্রিয় করে তোলার মাধ্যমেই স্বাধীন পাকিস্তান অর্জন করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর তারাই নানা কায়দায় অশুভ শক্তি ক্ষমতা দখল করে নেয়। স্বাধীন পাকিস্তানে আবারও কোটারী স্বার্থ এবং ভাল ও যোগ্যদের অধিকার বঞ্চনার ঘটনা ঘটে। এ প্রসংগে বঙ্গবন্ধুর সমন্বিত উদ্যোগের একটা উদাহরণ দেই। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেব তখন মুসলিম লীগের পক্ষে নন এবং অখন্ডÍ ভারতের পক্ষে। তাই তাঁকে অনুরোধ করতে তিনি হক সাহেবের বাড়িতে যান। এ প্রসংগে হোসেন সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব বললেন, “ভালই তো হত যদি তিনি আসতেন। কিন্তু আসবেন না, আর আসতে দিবেও না। তাঁর সাথে কয়েকজন লোক আছে, তিনি আসলে সেই লোকগুলির জায়গা হবে না কোথাও। তাই তাকে মুসলিম লীগের বাইরে রাখতে চেষ্টা করছে”।(৩৫- ৩৭ পৃষ্ঠা)
হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবের সততা ও সরলতার প্রেক্ষাপটে রাজনীতির বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর একটি লেখা আজকের রাজনীতিবিদদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে রয়েছে। মুসলিম লীগের নমিনেশন নিয়ে নানমূখী প্রসংগ বর্ণনা করে একপর্যায়ে এসে বঙ্গবন্ধু বলছেন “শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব ছিলেন উদার, নীচতা ছিল না, দল মত দেখতেন না, কোটারি করতে জানতেন না, গ্রুপ করারও চেষ্টা করতেন না। উপযুক্ত হলেই তাকে পছন্দ করতেন এবং বিশ্বাস করতেন। কারণ, তাঁর আত্মবিশ্বাস ছিল অসীম। তাঁর সাধুতা, নীতি, কর্মশক্তি ও দক্ষতা দিয়ে মানুষের মন জয় করতে চাইতেন। এজন্য তাকে বারবার অপমানিত ও পরাজয়বরণ করতে হয়েছে। উদারতা দরকার, কিন্তু নীচ অন্তঃকরণের ব্যক্তিদের সাথে উদারতা দেখালে ভবিষ্যতে ভালর থেকে মন্দই বেশি হয়, দেশের ও জনগণের ক্ষতি হয়।” তিনি শুধু রাজনৈতিক নেতাই ছিলেন না- একজন দার্শনিকও ছিলেন। তিনি বাঙ্গালী সর্ম্পকে নিজে অনুভব করেছেন, প্রত্যক্ষ করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন যা বাঙালী জাতির জন্য আজও চির সত্য। তিনি বলেন “আমাদের বাঙালিদের দুইটা দিক আছে। একটা হল ‘আমরা মুসলমান’ আর একটা হল ‘আমরা বাঙালি’। পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকাতর’। ঈর্ষা, দ্বেষ সকল ভাষায় পাবেন, সকল জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই, ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা, সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ার খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে। নিজেকে এরা চেনে না, আর যতদিন চিনবে না এবং বুঝবে না ততদিন এদের মুক্তি আসবে না।”(৪৭-৪৮ পৃষ্ঠা)
বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীর একটি বড় অবদান ও বৈশিষ্ট হচ্ছে তাঁর নিজ কলমে লেখা ভারত বিভাগের পূর্বাপর ঘটনাপঞ্জী। তিনি বলেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন শুধু ভারতবর্ষের হিন্দু ও মুসলমানদের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের রাজনৈতিক মেরুকরনই নয় ভারতের স্বাধীনতার বিষয়টিও মুখ্য ছিল। এজন্য তিনি নেতাজী সুভাষ বোসের আদানের কথাও উল্লেখ করেছেন। বৃটিশদের যুদ্ধ শেষের পর্যায়ে ভারতের স্বাধীনতার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও বলেছেন। বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে বৃটিশ গর্ভনমেন্ট ক্রিপস মিশন পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সে মিশন ফলপ্রসূ হয়না। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষে ১৯৪৬ সালে তারা ক্যবিনেট মিশন প্রেরণ করে। এভাবে দেশীয়-বিদেশীয় অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় ১৯৪৭ সালের যথাক্রমে ১৪ ও ১৫ আগষ্ট। (৪৯ পৃষ্ঠা)
বঙ্গবন্ধুর উদারতা বলে শেষ করা যাবে না। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি ভুল করা, ভুল স্বীকার করা ও শুধরে নেয়ার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে ভুলের বিষয়টি তুলে ধরেছেন যা আমাদের সকলের জানা উচিৎ। তিনি বলেছেন, “আমি অনেকের মধ্যে একটা জিনিস দেখেছি, কোন কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় পার হয়ে যায়, কাজ আর হয়ে ওঠে না। অনেক সময় করব কি করব না, এই ভেবে সময় নষ্ট করে এবং জীবনে কোন কাজই করতে পারে না। আমি চিন্তা ভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ, যারা কাজ করে তাদরেই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।” আসলেই যিনি কাজ করেন তাঁর করতে গিয়ে ভুল হতেই পারে এবং তাঁর ভুলটি ধরবার অনেক ব্যক্তি আঙ্গুল উঠায়ে দেখান কিন্তু যিনি কোন কাজই করেন না তাঁর ভুলও ধরার কোন সুযোগ নেই তারাই ভালো।(৮০ পৃষ্ঠা)
বঙ্গবন্ধু অতি সুন্দর করে তদানিন্তন কোলকাতায় চলমান হিন্দু মুসলমানের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার বর্ণনা তুলে ধরেছেন। এ দাঙ্গা বন্ধের জন্য অনেক হিন্দু ও মুসলমানের অক্লান্ত চেষ্টার চিত্রও তুলে ধরেছেন। হিন্দু মুসলমানের জন্য আবার মুসলমান হিন্দুর জন্য চোখের জল ফেলেছে, পরস্পর পরস্পরকে বাঁচাবার চেষ্টাও করেছেন। আবার রক্ষা করতে গিয়ে নিজে স্বজাতির হাতে নিগৃহীত হয়েছেন। তিনি মাহাত্মা গান্ধীর একটি জনসভা ও তার প্রতিক্রিয়া তুলে ধরেছেন। তিনি হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব এর সাথে নারকেল ডাঙ্গায় উক্ত সভায় যোগদান করেন। তিনি লিখেছেন “ব্যারাকপুরে পৌছে দেখি, এক বিরাট সভার আয়োজন হয়েছে। মহাত্মাজী রবিবার কারও সাথে কথা বলেন না, বক্তৃতা তো করবেনই না। মনু গান্ধী ও আভা গান্ধী ‘আলহামদু’ সূরা ও ‘কুলহু’ সূরা পড়লেন। তারপরে ‘রাম বন্দনা’ গান গাইলেন। মহাত্মাজী লিখে দিলেন, তাঁর বক্তৃতা সেক্রেটারি পড়ে শোনালেন। সত্যই ভদ্রলোক জাদু জানতেন। লোক চিৎকার করে উঠল, হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই। সমস্ত আবহাওয়ার পরিবর্তন হয়ে গেল এক মুহূর্তের মধ্যে।” আজ এমন মানবতাবাদী মানুষের সংখ্যা একেবারেই শূন্যের কোঠায়। এ প্রসংগে বঙ্গবন্ধু পূর্ববাংলায় অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশের মুসলমানদের সম্পর্কে হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেবের একটি মন্তব্যকে তুলে ধরেছেন। হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী সাহেব ইতোমধ্যে পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লী, জয়পুর ও আলোয়ার ঘুরে হিন্দু-মুসলিম ডাঙ্গার ভয়াবহতা দেখে এসে বঙ্গবন্ধুর সামনে বলেছিলেন, “সত্যিই পূর্ব বাংলার মুসলমানরা কত সভ্য ও ভাল, কোন দাঙ্গাহাঙ্গামা হচ্ছে না। তবে হিন্দুরা চলে আসছে, এরাই বিপদ ঘটাবে। আমি শীঘ্রই পূর্ব বাংলায় যাব এবং কয়েকটা সভা করব, যাতে হিন্দুরা না আসে।” অর্থাৎ পূর্ব বাংলার হিন্দু-মুসলমান মিলে মিশে সুন্দর ভাবে তখনও ছিল- এভাবে থাকাটাই নিরাপদ ও কাম্য।(৮১-৮৬ পাতা)
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন পাকিস্তানে ত্যাগী ও সংগ্রামী কর্মীদের দ্বারা সকল প্রকার সেবাই ব্যক্তি ও জন সম্পৃক্ততায় সুন্দর ভাবে চলতে শুরু করেছিল। দূর্ণীতিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলো। তারা এসকল ত্যাগী স্বেচ্ছাসেবকদের সকল কাজ থেকে বাদ দিয়ে দিল। ফলে চারিদিকে সরকারী সেবা কাজকর্মে বিঘœ সৃষ্টি হতে থাকলো। বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, “আস্তে আস্তে সকল কিছুতেই ভাটি লাগল, শুধু সরকারের নীতির জন্য। তারা জানতে চায় না, কি করে একটা জাগ্রত জাতিকে দেশের কাজে ব্যবহার করতে হয় এবং জাতিকে গঠনমূলক কাজে লাগানো যায়। হাজার হাজার কর্মী এদিক ওদিক ছিটকে পড়ল। কাজও ছিল এবং কর্মীও ছিল কিন্তু তাদের ব্যবহার করা হল না। এর একটা বিশেষ কারণ হল, যাদের কাছে ক্ষমতা এল তারা জনসাধারণের ওপর আস্থা রাখতে পারেন নাই। কারণ, জনসাধারণের সাথে এদের কোন সম্পর্ক ছিল না।” অর্থাৎ জনসম্পৃক্ততা ব্যতীত সু-শাসন বা সু-সেবা ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়।(৯০ পৃষ্ঠা)
বঙ্গবন্ধু তাঁর স্মৃতিচারণে কোটারী স্বার্থ কিভাবে স্বাধীনচেতা ত্যাগী নেতা-কর্মীদের নির্লিপ্ত করে দেয় তার চিত্র তুলে ধরেছেন। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল সদস্য এবং বঙ্গবন্ধুর মতাদর্শিক ব্যক্তিদেরও বাদ দেয়া হলো। ১৯৪৮ সালের পাকিস্তান সংবিধান সভায় বসে পাকিস্থানীদের কোটারী ও কয়েমী স্বার্থবাদী চরিত্র স্পষ্ট হয়ে গেলো। তারা ষড়যন্ত্র করল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করবার। সেদিন কংগ্রেসের একজন সদস্য বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান। বঙ্গবন্ধুর লেখায় তিনি বলেন, “সেখানে রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেই বিষয়ও আলোচনা চলছিল। মুসলীম লীগ নেতারা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ লীগ সদ্যস্যেরও সেই মত। কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করলেন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করা হোক। কারণ, পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা হল বাংলা। মুসলিম লীগ সদস্যরা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার।” রাষ্ট্রভাষার চেতনা সেদিনগুলোতে কিশোর-কিশোরী, যুবক, বৃদ্ধ সকলকেই প্রচন্ডভাবে আন্দোলিত করেছিল, করেছিল অনুপ্রানিত। ১৯৪৮ সালের মার্চমাসে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যদা আদায়ের আন্দলনের জন্য বঙ্গবন্ধুকে সদলবলে জেলহাজতে আবদ্ধ করে। জেলখানার বাহিরে মুসলিম গার্লস্ স্কুল। সেখানে কিশোর বয়সী ছাত্রীরা মুর্হুমুহু দিনভর স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে তুলতো। বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর সহযোগীবৃন্দ জেলখানায় বসে প্রত্যক্ষ করতেন। এ প্রসংগে বঙ্গবন্ধুর বর্ণনা অনাদিকাল তরুণ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে- এ বিশ্বাসে আমি তাঁর উক্তি তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন, “যে পাঁচ দিন আমরা জেলে ছিলাম সকাল দশটায় মেয়েরা স্কুলের ছাদে উঠে স্লোগান দিতে শুরু করত, আর চারটায় শেষ করত। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েরা একটুও ক্লান্ত হত না। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘বন্দি ভাইদের মুক্তি চাই’, ‘পুলিশি জুলুম চলবে না’- নানা ধরনের স্লোগান ”।রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে আমাদের প্রখ্যাত ভাটিয়াল আব্বাস উদ্দিন সাহেবের একটা অনুভূতি বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন। আব্বাস উদ্দিন সাহেব বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, “মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে।” বঙ্গবন্ধু আব্বাস উদ্দিন সাহেবকে কথা দিয়েছিলেন এবং কথা রেখেছিলেনও।(৯১-১১১ পৃষ্ঠা)
আমি পূর্বেই বলেছি, বঙ্গবন্ধু আজীবন দলে কোটারী স্বার্থ ও স্বজনপ্রীতিকে ঘৃণা করেছেন। তাঁর লেখায় যতদূর পাওয়া যায় পাকিস্তান সৃষ্টির ২ বছর পার না হতেই ১৯৪৯ সালের প্রথম ভাগেই মুসলিমলীগের প্রগতিশীল গ্রুপ আওয়ামী মুসলিমলীগ নামে নতুন একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধুর মতে, “১৯৪৭ সালে যে মুসলিমলীগকে লোকে পাগলের মত সমর্থন করেছিল, সেই মুসলিমলীগ প্রার্থীর পরাজয়বরণ করতে হল কি জন্য? কোটারী, কুশাসন, জুলুম, অত্যাচার এবং অর্থনৈতিক কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা গ্রহণ না করার ফলে। ইংরেজ আমলের সেই বাঁধাধরা নিয়মে দেশ শাসন চলল। স্বাধীন দেশ, জনগণ নতুন কিছু আশা করেছিল, ইংরেজ চলে গেল তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষণ থাকবে না। আজ দেখছে ঠিক তার উল্টা।” বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চেতনার একটি মুখ্য ও সুস্থ চিন্তাধারার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে, এখন মুসলিমলীগ নয় একটি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন দরকার যারা দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করবে কারণ মুসলিমলীগ কোটারী স্বার্থ ছেড়ে জনকল্যাণে কাজ করছেনা বা করবেও না। তাই তিনি সমি¥লিতভাবে মওলানা ভাসানী সাহেবের নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিমলীগ গড়ে তোলেন পরে যা আওয়ামীলীগ সংগঠনে রূপ নেয়।(১১৯ পৃষ্ঠা)
বঙ্গবন্ধু দেশ ও জনগনের কল্যাণে নিজের ব্যক্তি জীবনের উন্নতির কথা কখনোই ভাবেননি। এমনকি তাঁর পিতা বিলেত গিয়ে বারএটল’ পড়তে যাবার জন্য বললে তিনি বিনয়ের সাথে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। তিনি তাঁর পিতাকে তৎকালীন নবসৃষ্ট পাকিস্তানে জনগণের অবস্থা বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং নিজের দায়-দায়িত্ব বুঝিয়ে বলেন। তিনি লিখেছেন, “আমার ভীষন জেদ হয়েছে মুসলিম লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে। যে পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলাম, এখন দেখি তার উল্টা হয়েছে। এর একটা পরিবর্তন করা দরকার। জনগণ আমাদের জানত এবং আমাদের কাছেই প্রশ্ন করত। স্বাধীন হয়েছে দেশ, তবু মানুষের দুঃখ-কষ্ট দূর হবে না কেন? দুর্নীতি বেড়ে গেছে, খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছে। বিনা বিচারে রাজনৈতিক কর্মীদের জেলে বন্ধ করে রাখা হচ্ছে। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মুসলিম লীগ নেতারা মানছে না। পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প কারখানা গড়া শুরু হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। রাজধানী করাচি। সব কিছুই পশ্চিম পাকিস্তানে। পূর্ব বাংলায় কিছু নাই। আব্বাকে সকল কিছুই বললাম।” এভাবেই বঙ্গবন্ধু পিতার প্রস্তাব নিয়ে তাঁকে বুঝিয়ে নিজেকে দেশ সেবার কাজে সম্পৃক্ত রাখলেন। দেশসেবা প্রসংগে বঙ্গবন্ধু মওলানা ভাসানী ও শামসুল হক সাহেবের মধ্যকার সৃষ্ট দ্বন্ধ নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন যা শুধু রাজনীতিবিদদের জন্য নয় সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য। তিনি বলেন, “যে কোন মহৎ কাজ করতে হলে ত্যাগ ও সাধনার প্রয়োজন। যারা ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয় তারা জীবনে কোন ভাল কাজ করতে পারে নাই- এ বিশ্বাস আমার ছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, এদেশে রাজনীতি করতে হলে ত্যাগের প্রয়োজন আছে এবং ত্যাগ আমাদের করতে হবে দেশের জনগণকে সুখী করতে হলে” (১২৫ পৃষ্ঠা)। বঙ্গবন্ধুর এ আদর্শের কথাটি সকলের মনে গভীরভাবে জায়গা করে নিলেই সুষ্ঠু ও আদর্শিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি।
জাতির পিতা ঙ্গবন্ধুর রাজনীতির ভিত্তি ছিল বাঙালির প্রতি গভীর ভালবাসা ও বাঙালিত্ব। এ মহান বাঙালির গভীর মানবপ্রেম তথা বাঙালিপ্রেম তাঁর নোট বইএ নিজ হাতে লেখা দেখলে অনুধাবন করা যায়। তিনি লিখেছেন,“ একজন মানুষ হিসেবে সমগ্র মানব জাতি নিয়েই আমি ভাবি। একজন বাঙালি হিসেবে যাকিছু বাঙালিদের সঙ্গে সম্পর্কীত তাই আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। এই নিরন্তর সম্পৃক্তির উৎস ভালোবাসা, অক্ষয় ভালোবাসা, যে ভালেবাসা আমার রজনীতি ও অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে।” সেই বাঙালিত্ব রক্ষায় জাতির পিতা জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকেই চূড়ান্ত রূপ দিতে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর মহান সংসদে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করে সংবিধান পাশ করেন। কিন্তু পাকিস্তানী দোসরদের ষড়যন্ত্র কখনো থেমে থাকেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারা জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মধ্যদিয়ে দেশ ও জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতমুখী স্রোতধারায় নিয়ে যায়। ১৯৭৭ সালে তৎকালীন সেনা শাসক জিয়াউর রহমান এক সামরিক আদেশে সংবিধান থেকে অসাম্প্রদায়িকতাকে বিলোপ করে দেন। তিনি বাঙালি জাতিয়তাবাদকেও খন্ডিত করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং ১৯৮৮ সালের ৯ জুন দ্বিতীয় সামরিক শাসক হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ সংবিধানে শেষ পেরেকটি গ্রথিত করেন। তিনি ২(ক) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে রাষ্ট্রীয় ধর্ম ‘ইসলামকে’ সংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করার মধ্যদিয়ে বাস্তবিক অর্থে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও বাঙালির আবহমান কালের মানবিক ও মুক্তচিন্তার দরজা বন্ধ করে দেন। জাতির পিতার সেই আশঙ্কা আজ সত্য হতে চলেছে। তিনি বলেছিলেন,“আমি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার একটি চারা রোপন করেছি, এটা যদি কেউ উপড়ে ফেলে তাহলে বাংলাদেশ তার অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।” আজ চারিদিকে সাম্প্রদায়িক যে উস্কানী ও উন্মাদনা দেখা যাচ্ছে তা বাংলাদেশের দুই সামরিক শাসকের রোপিত বিষবৃক্ষের ফল। আজ গণতান্ত্রিক সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ সরকার ক্ষমতায় আমরা আশাকরব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে নিশ্চয়ই তারা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করবেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য তনয়া, দৃঢ়চেতা ও বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বপ্ন-সারথি বাঙালির আশা-আকাঙ্খার প্রতীক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন- মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে এদেশের নাগরিক হিসেবে এটাই আমাদের চাওয়া।

লেখক: প্রাক্তন সচিব ও গবেষক

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102