মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ১১:৩১ অপরাহ্ন

তোফায়েল আহমেদ

স্মৃতির মনিকূটায় এক বর্ণাঢ্য নক্ষত্রের তিরোধান

অধ্যাপক ড. এ কে আব্দুল মোমেন
  • খবর আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ১৩ এই পর্যন্ত দেখেছেন

আজ থেকে প্রায় ৬১ বছর আগে ১৯৬৫ সালে জনাব তোফায়েল আহমেদ ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। তখন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু শাব্বির আহমদ যিনি সিলেট ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি তখন জেলে এবং তৎকালীন গবর্ণর মোনায়েম খান আদেশ জারি করেন যে, তাকে রাসটিকেট করা হলো অর্থাৎ সে পূর্ব পাকিস্তানের কোনো কলেজে পড়তে পারবে না। তার অপরাধ হচ্ছে সে প্রেসিডেন্ট আইয়ূব খান সাহেব যখন সিলেট সার্কিট হাউসে বক্তৃতা দিতে দাঁড়ান তখন সে উনাকে লক্ষ্য করে সেন্ডেল ছুড়ে মারে এবং তা মাইক্রোফোনে গিয়ে লাগে। সে তার বাবা আব্দুল বারি সাহেব যিনি তখন বিডি চেয়ারম্যান ছিলেন তাঁর কার্ড নিয়ে সম্মুখ সারিতে বসার সুযোগ পায়। বারি সাহেব অসুস্থ ছিলেন বলে ঐ সভায় যেতে পারেননি।

তৎকালীন সিলেটের ডিসি জনাব ড. এ কে এম রব্বানী যাকে আমি ব‍্যক্তিগতভাবে চিনতাম তাকে অনেক অনুনয় নিবেদন করা সত্ত্বেও শাব্বিরকে মুক্ত করতে পারিনি। তার বাবা বারি চাচা পয়সা ওয়ালা ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ছেলেকে মুক্ত করার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। ঢাকায় এসে এ-টিম- মাসুদ সাহেব যিনি পরবর্তীতে হাইকোর্ট জজ হন এবং এক সময় চীফ ইলেকশন কমিশনারও হয়েছিলেন এবং যার মেয়ে জাস্টিস সালমা মাসুদ একটি ঐতিহাসিক রায় দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন (তার রায় ছিল কাউকে গ্রেফতার করলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে অবশ্যই পরিবারকে তার কারণ জানাতে হবে। নতুবা ছেড়ে দিতে হবে) তাকে উকিল নিযুক্ত করেন। মাসুদ সাহেব অনেক চেষ্টা করে সাব্বিরকে জেলমুক্ত করতে পারেননি।

বন্ধুবর সাব্বিরকে জেল থেকে ছাড়াতে তোফায়েল ভাইয়ের সাথে প্রথম পরিচয় ১৯৬৫ সালে। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ যেমন শেখ মনি, রাজ্জাকভাই, তোফায়েল ভাই প্রমুখের কাছে ধন‍্যা দেই। রাজ্জাক ভাই অনেক চেস্টা করেন তবে ব‍্যার্থ হন।

আমি তখন এস-এম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলাম এবং এ হলে এন-এস-এফ এর নেতা জমির আলী থাকতেন। রাজ্জাকভাই পরামর্শ দিলেন আমি যেন জমির আলীকে সাব্বিরের মুক্তির জন্য অনুরোধ করি। জমির আলী রাজি হলেন এবং তাকে মুক্ত করতে স্বক্ষম হন। মুক্তি পেয়ে সাব্বির পশ্চিম পাকিস্তানের লাহুরে পাঙ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চলে যায়। সাব্বিরের ছোটভাই খালেদ মিশিগান আওয়ামী লীগের নেতা এবং আরেকভাই তাহমিদ সিলেটে বড় ব্যবসায়ী এবং তার হোটেলে আওয়ামীলীগ নেতারা সব সময় অবস্থান করেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে পর সাব্বির ফিরে আসে এবং জাসদ করা শুরু করে এবং তারপর লন্ডনে পাড়ি জমায়।

সাব্বিরের কারণে তোফায়েল ভাইর সাথে আমার প্রথম পরিচয় তা আগেই উল্লেখ করেছি। ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসুর সহসভাপতি হবে ইকবাল হল থেকে। জিন্নাহ হল থেকে এনএসএফের নাজিম কামরান চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন। এনএসএফ নেতা মাহবুবুল হক দোলন ও জমির আলীকে তোফায়েল আহমেদকে সমর্থন দিলে তিনি ডাকসুর সহ-সভাপতি বা ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণ আন্দোলনে তোফায়েল ভাইয়ের নেতৃত্ব ও অবদান অতুলনীয় এবং অন‍্যন‍্য। তিনিই জাতির মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানকে বৃহত্তর বাঙ্গালী জাতির পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তাঁর অবদান অপরিসীম যা জাতি সবসময়ই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে । তিনি সত্যিই একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ । জাতি তাঁর কাছে চির ঝৃণী।

১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ঠতা

বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব খানের রাউন্ড টেবিল করফারেন্সে রাওয়ালপিন্ডিতে যোগদান করেন আমি তখন সর্বক্ষণই উনার সাথে সাথে ছিলাম। বঙ্গবন্ধু আইয়ূব খানের “বেশেহত” অর্থাৎ ইসলামাবাদ শহর দেখতে চান। তাই আমায় অনুরোধ করলে আমি বল্লাম যে উনি চাইলেই যেতে পারেন কারণ উনার কাছে ইস্ট পাকিস্তান হাউজের একাধিক লিমোজিন আছে। বঙ্গবন্ধু বল্লেন, না তিনি ঐঠিকঠিকির গাড়ি অর্থাৎ সরকারি গাড়িতে করে ইসলামাবাদ দেখতে তিনি যাবেন না। বহুকস্ট করে আমি যখন একটি বেসরকারি গাড়ি জোগাড় করলাম তখন ইসলামাবাদ দেখার তাঁর আর সময় হয়নি। তাই তাঁর ইসলামাবাদ দেখা সম্ভব হয়নি।

বঙ্গবন্ধুর ইসলামাবাদ দেখা হলো না?

ইসলামাবাদ থেকে ঢাকায় ফিরে ৩২ নম্বরে যাই বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে। ওখানে তখন তোফায়েল ভাইর সাথে দেখা হয়। বঙ্গবন্ধু যারা ওখানে ছিলেন তাদের সবাইকে কৌতুক করে আমার পরিচয় দিয়ে বল্লেন “এই হচ্ছে মোমেন যে আমাকে ইসলামাবাদ দেখায়নি” (তিনি সময় দিতে পারেননি)।

তারপর ১৯৭৮ সালে আমেরিকায় চলে আসায় আর কারো সাথে অনেকদিন দেখা হয়নি। তাছাড়া আমার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক বছর দেশে যেতে পারেনি।

তোফায়েল ভাই সফল বানিজ‍্যমন্ত্রী

তোফায়েল ভাই সফল বানিজ‍্যমন্ত্রী। তার সময়ে রমজানেও নিত‍্য পণ‍্যের দাম খুব একটা বৃদ্ধি পায়নি। তিনি আগেভাগেই ব‍্যবস্স্থা নিতেন।

ঢাকায় উনার সাথে সাক্ষাৎ করি দুটো কারণে। তখন তিনি বানিজ্য মন্ত্রী। এক— বাংলাদেশ সরকার যে নিয়মে জিনিসপত্র ক্রয় করে সে নিয়মের ফলে প্রতিযোগিতা কম হয় এবং ছড়াদামে জিনিসপত্র কিনতে হয়। এ নিয়ম পরিবর্তন করা সম্ভব কিনা এবং দ্বিতীয়ত সিলেটের শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় টী-অকশন হাউস বা চা-নিলাম কেন্দ্র চালু করা সম্ভব কিনা।

দুর্নীতি বন্ধের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া তবে তা দুর্নীতি বৃদ্ধি করে ?

প্রথম বিষয়টি নিয়ে তিনি জানালেন যে সরকার দূরনীতি কমানোর জন্য এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার নিয়ম চালু করেছে এবং তিনি স্বীকার করলেন যে এরফলে ক্রয়মূল্য যেমন বেশি হয়, প্রতিযোগিতাও সীমিত হয়ে পড়ে।

বস্তুত আমাদের দেশে কিছু কিনতে গেলে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা কিনতে হয়। সবাই টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রতিযোগিতা করতে বা টেন্ডার দিতে পারে না। যে টেন্ডারে প্রতিযোগিতা করবে তাকে সাধারণতঃ টেন্ডারের সাথে ২.৫% শতাংশ ডিপোজিট প্রদান করতে হয় এবং টেন্ডার পেলে আরো ৫% বা ১০%;শতাংশ জমা দিতে হয় ।

যদি টেন্ডারের সর্বোচ্চ মুল্য হয় ১০০ মিলিয়ন ডলার, তাহলে তাকে ২.৫ মিলিয়ন ডলার সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসাবে জমা দিতে হবে টেন্ডারে অংশ গ্রহণের জন্য যা অধিকাংশ সরবরাহকারীর জন্য সংগ্রহ করা দুস্কর। সুতরাং প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে যায়। দ্বিতীয়ত অধিকাংশ সরবরাহকারী বিদেশি কোম্পানি থেকে বা ব‍্যাংক থেকে ছডা সুদে তা সংগ্রহ করে যা তারা তাদের টেন্ডারে খরচ হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করে। তারফলে দাম বেডে যায়। সুতরাং এই পদ্ধতির বিকল্প পন্থা অবলম্বন করলে খরচ কমবে। আমেরিকায় কেনাকাটায় এই টেন্ডার প্রত্রিুয়া এত সোচ্চার নয়। এখানে নামীদামী সরবরাহকারীদের কাছ থেকে সরাসরি কেনা যায়। প্রায় ক্ষেত্রেই নামীদামী কোম্পানিগুলো টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস করে না এবং বিশেষভাবে উল্লেখ‍্য যে তারা সিকিউরিটি ডিপোজিট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা বলে তাদের কোম্পানির নামই যথেষ্ট, এটাই তাদের গেরান্টি ২.৫% সিকিউরিটি ডিপোজিট প্রদান তাদের জন্য অপমানজনক। বস্তুত কোম্পানির নামই তাদের সিকিউরিটি ডিপোজিট।

তিনি বল্লেন য়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতির কমানোর জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে এবং তিনি স্বীকার করেন যে এরফলে খরচ বাড়ে এবং প্রতিযোগিতাও সীমিত হয়ে পড়ে। তবে এ নিয়ম পরিবর্তন করলে সবাই দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ ব্যাপক অভিযোগ করবে, বিশেষ করে সংবাদমাধ্যম সোচ্চার হয়ে উঠবে। সুতরাং তার পক্ষে এই প্রচলিত নিয়ম বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তিনি উপদেশ দিলেন যে আপনারা লেখালিখি করে জনমত গড়ে তুলুন এবং টেন্ডারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত গঠিত হলে পর তিনি তা পরিবর্তন করতে পারবেন বলে অঙ্গীকার করেন।

শ্রীমঙ্গলে চা-নিলাম কেন্দ্র স্থাপনে তোফায়েল ভাইয়ের অবদান

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় চা-নিলাম কেন্দ্র স্থাপন প্রসংঙ্গে।

আমি সত্তোর দশকের শুরুতেই সিলেট লাকাতূডা চা বাগানে (যা দেশের দ্বিতীয় পুরোনো চা-বাগান) এসিসটেন্ট মেনেজার হিসাবে কাজ করি। তখন জানতে পারি যে, ব্রিটিশ আমলে সর্বপ্রথম ১৮৬১ সালে কলিকাতায় চা-নিলাম কেন্দ্র স্থাপিত হয় (সিলেটের মালনিছডা চা-বাগান ১৮৫৪ সালে স্থাপিত হয় যা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রথম চা-বাগান) এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম চা-নিলাম কেন্দ্র চট্টগ্রামে স্থাপন করা হয়। ইতিপূর্বে শুধু মাত্র লন্ডনে নিলাম হতো।

যখন চট্টগ্রামে চায়ের নিলাম কেন্দ্র চালু হয় তখন সিলেটে তা স্থাপনের জন্য জোর দাবি উঠেছিল এজন‍্য যে তখন সিলেট এলাকায় দেশের ৯৯% চা বাগান অবস্থিত ছিল (বর্তমানে পার্বত্য‍ চট্টগ্রাম ও উত্তর বঙ্গে চা-বাগান বৃদ্ধি পাচ্ছে)। তবে চট্টগ্রামে সমুদ্র বন্দর থাকায় যার মাধ্যমে সহজেই চা ইংল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া সম্ভব তাই তারা তা চট্টগ্রামে স্থাপন করে। প্রথম দিকে নিলাম হতো লন্ডন মার্কেটে এবং চট্টগ্রামে মুলত গোদাম ছিল।

নিলামটা নিন্মোক্তভাবে হয়। প্রথমত বাগান থেকে চা চাবাক্সে বা টী-চেস্টে ভরে চট্টগ্রামে নিলাম হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। আগে মুলত ট্রেনে করে তা নিয়ে যাওয়া হতো। এখন ট্রেনের বগি যথাসময়ে যথেষ্ট না পাওয়ার কারণে ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক সময় চা-ভর্তি ট্রাক নিখোঁজ হয়ে গেলে চা মালিকরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হন। চট্টগ্রামে প্রতি মাসে চারদিন নিলাম উঠে। নিলাম শেষ হলে পর ঐ চা নিজ নিজ বাগানের ওয়ার হাউজে চলে যায় এবং ঐ বাগান থেকেই বিভিন্ন ক্রেতাদের কাছে পাঠানো হয় এতে খরচ অনেক বেড়ে যায়। বস্তুত চা-শিল্পে সরবরাহ বা যাতায়াত বাবদ খরচ তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে বেশি। খরচ কমানোর জন্য তাই আমার প্রস্তাব ছিল শ্রীমঙ্গলে একটি চা-নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করা হোক। ইতিপূর্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রীমঙ্গলে যা চা-এর রাজধানী হিসাবে পরিচিত সেখানে অনুরূপ প্রতিষ্ঠান স্থাপনে আপত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন।

তোফায়েল ভাই আমার প্রস্তাবে রাজি হলেন। তবে বাধ সাধলেন অনেকে।অধিকাংশ চা কোম্পানির বড় বড় গোদাম রয়েছে চট্টগ্রামে। তাছাড়া অফিসার ও অকশোনিয়াররা থাকেন চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম থেকে সিলেটে আসা যথেষ্ট সময় সাপেক্ষ। ডাইরেক্ট কোনো বিমান সার্ভিস নেই। তাছাড়া ট্রেনের অবস্থাও মধ‍্যযুগীয়। তথন কোনো এসি বগি ছিল না। অকশোনিয়ারদের চাটগা থেকে শ্রীমঙ্গলে আসতে গেলে প্রথমে ঢাকায় যেতে হয় এবং সেখান থেকে সিলেট বিমান বন্দরে গিয়ে আরো দুই বা আড়াই ঘন্টা গাড়িতে শ্রীমঙ্গল পৌঁছাতে হয়। তাছাড়া শ্রীমঙ্গলে ইসপাহানীর গোডাউন ছাড়া আর কারো কোনো গোডাউন নেই। চা-কর্পোরেশনের বড় সাহেব একজন মেজর জেনারেল সাহেব তাতে আপত্তি জানালেন। বড় বড় চা-কোম্পানিগুলোর জোর তদবিরের ফলে আমার প্রস্তাবটা ভেস্তে যাচ্ছিল। তবে তখন বানিজ্য মন্ত্রণালয়ে আব্দুর রউফ নামে একজন অতিরিক্ত সচিব ছিলেন যার বাড়ি কূলাউডায় এবং তিনি আমাকে যারপরনাই সহায়তা করেন। তোফায়েল ভাই সুপারিশ করলেন যে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জনাব আবুল মাল আব্দুল মুহিতভাইকে দিয়ে ডিও পাঠাতে। মুহিত ভাইয়ের সুপারিশ পাওয়ার পর সকল প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে তোফায়েল ভাই আমার অনুরোধ রক্ষা করেন এবং শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় চা-নিলাম কেন্দ্র স্থাপন করেন। তাছাড়া আমার অন‍্য প্রস্তাব ছিল যে শ্রীমঙ্গলে একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে তাতে টী-অকশন হাউজ, টী-গবেষণা কেন্দ্র, টী-একজিভশন কেন্দ্র, টী-প্রদর্শন কেন্দ্র যেখানে চায়ের এবং চা-শ্রমিকদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ইতিবৃত্ত সংগৃহীত থাকবে। তাছাড়া চা-কিভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয় তার প্রদর্শনী থাকবে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

পরিণত বয়সে তোফায়েল ভাইয়ের হতাশা?

আমি মাঝেমধ্যে সংসদে দেশের দুর্নীতি বন্ধ করার কথা উল্লেখ করি বিশেষ করে দেশের প্রায় প্রজেক্টগুলো সময় মতো সম্পন্ন হয়না (সেজন্য দক্ষিন কোরিয়ার জেনারেল পার্কের নিয়ম অনুসরণ করার কথা বলি), সরকারি দপ্তরে অহেতুক হয়রানি করা হয় ঘুষ বা দুর্নীতির জন্য, সরকারি কর্মচারীদের প্রতিবছর সম্পদের হিসাব দেয়া উচিত, মালবাহী ট্রাক শহরে ঢুকতে গেলে চাঁদা দিতে হয় যারফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, পাসপোর্ট অফিসে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয়না, কালো টাকা সাদা না করে মার্কেট রেটে লেনদেন বা বেচাকেনা করা উচিত যেটা আমেরিকাতে করা হয় সে নিয়ম চালু করা, জেলায় জেলায় জেলা সরকার প্রতিষ্ঠা করা অথবা দেশে আভ‍্যন্তরিক রাজস্ব বাড়ানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো যারই এনআইডি (আমেরিকায় যারই সোসাল সিকিউরিটি কার্ড) কার্ড আছে তার জন্য বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা, ইত্যাদি ইত্যাদি।

একদিন তোফায়েল ভাই তাঁর কাছে বসতে বল্লেন। পাশে আমুভাইও ছিলেন। বল্লেন আপনাকে একটি কথা বলতে চাই। আপনি যে ইস্যুগুলো তুলে ধরছেন তা খুবই উত্তম। তবে আমরা যেহেতু সিনিয়র সংসদ সদস্য সুতরাং আমরা কিন্তু এখন মুক ও বধির— একথাগুলো তুলে ধরতে পারি না। আপনি তুলছেন বলে আপনাকে ধন্যবাদ। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনেছি। আমরা এখন এগুলো বলতে পারি না। আমাদের অনুরোধ করলে পর আমরা বক্তব্য দেই। নতুবা দেই না। জানেন সংসদে তর্ক-বিতর্ক না হলে আনন্দ নেই। কিন্তু ইদানীং এগুলো অনুপস্থিত। তর্ক বিতর্কের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে এটা একটা বড় অর্জন হবে।

আজ তোফায়েল ভাই না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। তাঁর মাগফেরাত কামনা করি। মহান আল্লাহ পাক যেন তাঁকে জান্নাত নসিব করেন— আমিন।

লেখকঃ সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক ড. এ কে আব্দুল মোমেন, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘের স্থায়ী রাষ্ট্রদূত 

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102