

দেওয়ান রফিকুল হায়দারঃ পদ্মা সেতু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বিস্তারিত লেখার আগে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে প্রমত্ত পদ্মার বুকে কি ভাবে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলো তা আমি আজকের লেখায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদে দেয়া প্রশ্নোত্তর পর্বে ব্স্তিারিত যা বলেছেন তা-ই আমি তুলে ধরছি। যার ফলে আমার পাঠকরা সত্যিকারের পদ্মা সেতুর ইতিহাস জানতে সুবিধা হবে।
গত ২৯ জুন বুধবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে সরকারী দলের সংসদ সদস্য মেরিনা জাহানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন –
”ষড়যন্ত্রের কারণে আমাদের সেতু নির্মাণ দুই বছর বিলম্ব হয়েছে কিন্তু আমরা শেষ পর্য্যন্ত অন্ধকার ভেদ করে আলোর মুখ দেখেছি। দেশি ও বিদেশি সকল যড়যন্ত্র এবং বাধা – বিপত্তি পেরিয়ে পদ্মা সেতুর স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ পেয়েছে। এ সেতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের আবেগ, আমাদের সৃজনশীলতা, আমাদের সাহসিকতা, সহনশীলতা এবং আমাদের প্রত্যয়। আমরা এ সেতু করবোই এই ”জেদ”। শেষ পর্য্যন্ত অন্ধকার ভেদ করে আমরা আলোর মুখ দেখেছি। পদ্মার বুকে জ্বলে উঠেছে লাল, নীল, সবুজ, সোনালী আলোর ঝলকানি। ৪২টি স্তম্ভ যেন স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন, বাঙালীকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবেনা, পারেনি। আমরা বিজয়ী হয়েছি।
আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ২০০১ সালের ৪ জুলাই মাওয়া মাওয়া পয়েন্টে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমি পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করি। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে মাওয়া প্রান্তে সেতু নির্মাণের কার্য্যক্রম বন্ধ করে দেয়। তারা জাপান সরকারকে পুনরায় মানিকগঞ্জের আরিচা প্রান্তে পদ্মা সেতুর জন্য সমীক্ষা করতে বলে। দ্বিতীয়বার সমীক্ষার পর জাপান মাওয়া প্রান্তকেই নির্দিষ্ট করে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিবেদন পেশ করে। ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে সেতুর বিন্তারিত ডিজাইন প্রণয়নের লক্ষ্যে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজে বিস্তারিত ডিজাইন চুড়ান্ত করা হয়। ২০১১ সালের এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে সেতু প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাইকা ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) এর সাথে ঋন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজের নির্মাণ কাজ তদারকির জন্য পরামর্শক প্রতিণ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দূর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা এবং আইডিবি ঋণচুক্তি স্থগিত করে। সর্বশেষে ২০১৭ সালে কানাডার টরেন্টোর একটি আদালতে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে বিশ্বব্যাংক এ প্রকল্পে ফের ফিরে আসার ঘোষণা দিলেও দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিশ্বব্যাংকের ঋণ গ্রহণ না করে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। বহু কাঙ্খিত পদ্মা সেতু প্রকল্পের সূচনালগ্নে দেশি, বিদেশী যড়যন্ত্র , চ্যালেঞ্জসমূহের উত্তরণ এবং হার না মানা সুদৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে সব প্রতিক‚লতাকে জয় করে এ সেতু আজ স্বপ্ন নয়, একটি দৃশ্যমান বাস্তবতা।
শেখ হাসিনা বলেন, এতে কোটি কোটি দেশবাসীর সঙ্গে আমিও আনন্দিত, গর্বিত এবং উদ্বেলিত। অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে আর ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে প্রমত্ত পদ্মার বুকে আজ বহু-কাঙ্খিত সেতু দঁড়িয়ে গেছে। এ সেতু শুধু ইট-সিমেন্ট-ষ্টিল-লোহা-কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয় এ সেতু আমাদের অহংকার, আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা আর মর্য্যাদার প্রতীক। এ সেতু বাংলাদেশের জনগণের।
পদ্মা সেতু চালু হওয়ার ফলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের রেল যোগাযোগ সৃষ্টি, ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশ, কৃষি, ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প, ক্ষুদ্রশিল্প ইত্যাদির ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি, জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতির বিস্তৃত ক্ষেত্রেও প্রভাব সৃষ্টি সহ দেশের বিভক্ত দুটি অঞ্চলকে একত্রিভ‚ত করে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক এবং সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করবে।
পদ্মা সেতুকে ঘিরে সৃষ্ট অর্থনৈতিক কর্মকান্ড একদিকে যেমন বেকারত্ব হ্রাসে ভ‚মিকা পালন করবে তেমনি দারিদ্র দূরীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এছাড়াও সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগের ফলে সাধারণ মানুষের বিপুল কর্মঘন্টার সাশ্রয় হবে এবং জীবনমান উন্নত হবে।” (সূত্র : ইউকেবিডিটিভি.কম)
সেতু নির্মাণের বিস্তারিত বিবরণ:
মূল সেতু নির্মাণের কাজ করছে চীনের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানী ও নদী শাসনের কাজ করছে দেশটির আরেকটি প্রতিণ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। দুটি সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের আব্দুল মোমেন লিমিটেড। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বহুমুখী সেতুর মূল আকৃতি হচ্ছে দোতলা। কংক্রিট ও স্টিল দিয়ে নির্মিত হয়েছে সেতুর মূল কাঠামো।
সেতু নির্মাণের সকল অনিশ্চয়তা কাটে ২০১৩ সালে, যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজম্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন। তবে এর আগে সেতুতে পরিবর্তন আসে। যুক্ত হয় রেলপথ। ২০১৫ সালের ১৫ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন। তখন পরিকল্পনা ছিলো ২০১৮ সালের নভেম্বরে সেতুর কাজ শেষ হবে। কিন্তু কারিগরি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দুই দফা বেড়েছে সেতুর নির্মাণ সময়। নদীর তলদেশে কাঙ্খিত পাথরের স্তর না থাকায় সেতুর ১১টি পিলারের নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। চুড়ান্ত নকশা হয় ২০১৮ সালের জানুয়ারীতে। এর পর থেকেই পর্য্যায়ক্রমে কাজ চলতে থাকে। বিভিন্ন চড়াই উৎরাই পেরিয়ে শেষ পর্য্যন্ত ২০২২ সালের ২২শে জুন কাজ সম্পুর্ণ ভাবে সেতুর কাজ শেষ করার পর বাংলাদেশের সেতু কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ। এরপর ২৫শে জুন শনিবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কষ্টের ফসল প্রমত্ত পদ্মার বুকে নির্মিত দ্বিতল বিশিষ্ট বহুমুখী পদ্মা সেতু প্রকল্পটির উদ্বোধনীর মধ্য দিয়ে সফল বাস্তবায়ন ঘটলো।
জাতির পিতা মরহুম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের বুকে রেখে দিলেন তাঁর এক অনবদ্য কীর্তি পদ্মা সেতু। মূলত: পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বাংলাদেশ বিরোধী চক্রের কথিত দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়ার পর বিশ্বব্যাংক সরে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ’জেদ’ ধরলেন যে, আমাদের নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করবো। আর এই ’জেদের’ ফসলই আজকের এই পদ্মা সেতু। ছোটবেলায় মুরুব্বিদের কাছে শুনেছি ভাল কাজ করার জন্য ’জেদ’ ধরলে জীবনে কৃতকার্য্য হওয়া যায়। তার প্রমাণ আজ পেলাম আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। আর এ কারণেই আমি তাঁকে ’লৌহ মানবী’ বলে আখ্যায়িত করি।
পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান :
বাংলাদেশের দীর্ঘতম পদ্মা সেতু গত ২৫শে জুন ২০২২ শনিবার লাখো মানুষের উপস্থিতিতে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ’লৌহ মানবী’ শেখ হাসিনা শুভ উদ্বোধন করেন। এ সময় পদ্মার দু’পাড়ে মাওয়া ও জাজিরায় ছিলো লাখো মানুষের মধ্যে আনন্দের উৎসব। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী প্রথম টোল দিয়ে এ সেতু পার হন। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুতে আনুষ্ঠানিক ভাবে গাড়ি চলাচল শুরু হলো। পরদিন ২৬শে জুন রবিবার থেকেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় পদ্মা সেতু। এই সেতু উদ্বোধনীর মধ্য দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের জেলার স্েঙ্গ ঢাকা সহ সারা দেশের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হলো। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে যাতায়াতের সময় এবং খরচ দুই-ই কমেছে। ফেরির জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা আর অপেক্ষা করতে হবেনা।
এক সময়ে ফেরিতে এই পদ্মা নদী পাড়ি দিতে এপার এবং পাড়ের মানুষের যে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিলো আজ তার অবসান ঘটলো। খরস্রোতা ভয়াল এই পদ্মা নদী পাড়ি দিতে গিয়ে ল্ঞ্চ ডুবিতে কত মানুষের যে অকাল মৃত্যু হয়েছে তা একমাত্র ভুক্তভোগিরাই জানে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগ সহ বিভিন্ন দলের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। বিএনপি নেতৃবৃন্দকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তারা আসেননি। এ ছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পীকার, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রি পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর, কূটনীতিক সহ বিভিন্ন পেশাজীবি সংগঠনের প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষ।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে এ সমাবেশে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রি পরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম ও পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের পরিচালক মো: শফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে ভাষণ শেষে স্মারক ডাক টিকিট, স্যুভেনির শিট, উদ্বোধনী খাম, সিলমোহর ও ১০০ টাকার স্বারক নোট উদ্বোধন করা হয়।
সূধী সমাবেশে বক্তব্য প্রদানকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুকে ’বাংলাদেশের গর্ব, সম্মান ও মর্য্যাদার প্রতীক’ আখ্যায়িত করে বলেন, সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে বহুল প্রতীক্ষিত সেতুটি এখন প্রমত্তা পদ্মার বুকে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলেন, লাল, নীল, সবুজ, সোনালী আলোর ঝলকানী। ৪১টি স্প্যান যেন স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে বাংলাদেশের মানুষ গর্বিত। সেই সঙ্গে আমিও আনন্দিত এবং উদ্বেলিত। অনেক বাঁধা – বিপত্তি উপেক্ষা করে এবং ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আজকে আমরা এই পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছি।
এই সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এই সেতু দুই পারের যে বন্ধন সৃষ্টি করেছে, তাই নয়, এই সেতু শুধু ইট- সিমেন্ট- স্টিল- লোহার কংক্রিটের একটি অবকাঠামো নয- এ সেতু আমাদের অহঙ্কার, আমাদের গর্ব, আমাদের সক্ষমতা আর মর্য্যাদার প্রতীক।
তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতু নির্মান কাজের গুণগত মান নিয়ে কোনো আপোস করা হয়নি। এই সেতু নির্মাণে রয়েছে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও উপকরণ দিয়ে, সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই সেতুর উপরের ডেক দিয়ে যানবাহন এবং নীচের ডেক দিয়ে চলাচল করবে ট্রেন। সেতুর রেল লাইন চালু হলে পর সড়ক ও রেলপথে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এর ফলে একদিকে যেমন এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘ দিনের ভোগান্তি লাঘব হবে অন্যদিকে অর্থনীতি হবে বেগবান। তাদের ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটবে এবং জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন হবে। আশা করা যাচ্ছে, এ সেতু জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ১ দশমিক ২৩ শতাংশের বেশি হারে অবদান রাখবে এর ফলে দারিদ্র নিরসন হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ সেতুকে ঘিরে গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাইটেক পার্ক। ফলে দেশি বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং দেশে শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত হবে। পদ্মা সেতু এশিয়ান হাইওয়ের সাথে সংযোগের একটা বড় লিংক। তাই আঞ্চলিক বাণিজ্যে এই সেতুর ভ‚মিকা অপরিসীম।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকে বাংলাদেশের ’বিশাল অর্জন’ বলে জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি মার্সি টেম্বন।
শনিবার সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার। আমরা এই সেতুর গুরুত্ব বুঝতে পারি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ ব্যাপক ভাবে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে। পদ্মা সেতুর ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে, ভ্রমণের সময় কমে আসবে। কম সময়ে কৃষক খামারে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি বয়ে আনবে এবং কমাবে দারিদ্রতাও। পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় তিনি আনন্দ প্রকাশ করে বলেন, এ সেতুর কাজ শেষ হওয়ায় বাংলাদেশ লাভবান হবে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিনের সহযোগী হিসেবে আমরা নিবিড় ভাবে বাংলাদেশের পাশে আছি। উল্লেখ্য যে, পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে বিশ্বব্যাঙ্ক চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে পিছু হঠেছিলো বিশ্বব্যাংক। এ নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়নের পর সরকার নিজ অর্থায়নে এই সেতু নির্মাণের পথে এগিয়ে যায়। ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় (৩.৮৭ বিলিয়ন ডলার) নির্মিত এই সেতুর উদ্বোধন হয়েছে গত শনিবার ২৫শে জুন।
পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখে দেশের মানুষ খুশীতে আবেগ আপ্লুত হয়ে পরে,বিশেষ করে পদ্মা পারের মানুষের আনন্দটাই ছিলো বেশি। কারণ এই ভয়ঙ্কর পদ্মাই ছিলো তাদের জন্য কাল। তাদের অনেকেই বংশ পরম্পরায় হারিয়েছে মা বাবা, ভাই বোন , স্বামী, ছেলে- মেয়ে, আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব এই পমত্তা পদ্মার পানিতে। আর তাদের আনন্দ এখানেই যে, পদ্মার পানিতে পড়ে আর মরতে হবেনা। এখন এই সেতুর উপর দিয়েই হবে তাদের নিরাপদ চলাচল।
আমার কাছে একটি ব্যাপার খুবই বেমানান লেগেছে যে, ২৫জুন সেতু উদ্বোধন হলো। সবাই আনন্দ উল্লাস করলো কিন্তু পদ্মা পারের যে মানুষগুলো বেশি খুশী হলো তাদের কাঙ্খিত সেই সেতুটি উপরে ওঠার কোন সুযোগ দেয়া হলো না। আমার মতে সেতু কর্তৃপক্ষ এটা খুবই বেমানান কাজ করেছেন।
২৫ জুন জনগণের আকাঙ্খিত পদ্মা সেতু উদ্বোধন করেই পরদিন ২৬ তারিখ থেকেই যান চলাচল শুরু করে দেয়ার কারণ আমার বোধগম্য হলো না। শুধুমাত্র পদ্মার দু’পারের মানুষই নয়, বহু দূর দূরান্ত থেকে মানুষ তাদের দীর্ঘ দিনের প্রতিক্ষিত এই সেতুটি দেখার জন্য এসেছিলেন। তাদের আশা ছিলো, সেখানে গিয়ে পরিবার পরিজন, বন্ধু – বান্ধব নিয়ে একটা ফটো তুলবে, ভিডিও করবে, বাড়িতে গিয়ে সবাইকে আনন্দ করে দেখাবে। আর এই ছবি এবং ভিডিওগুলো হতো তাদের বংশ পরম্পরার জন্য একটা ইতিহাস। তাদের সে আশা হলো গুড়ে বালি!
আমার মতে, সেতু উদ্বোধন হওয়ার পর অন্তত: কয়েকটা দিন সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখা দরকার ছিলো। তখন মানুষগুলো তাদের শখ মিটিয়ে সেতুটি দেখতে পারতো। মনের আশা পূরণ করতে পারতো।
এ দিকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরদিনই দেখা গেলো ব্রিজের একপাশের একটি জায়গায় একজন লোক একটি নাটবল্টু হাত দিয়ে খুলছে। এ সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন তাকে ধরে ফেলে। বিচারের আওতায় তাকে নেয়া হবে। তবে সেতুতে যারা কর্মরত তারা বলছেন, সেতুর ছোট ছোট কিছু কাজ বাকি রয়েছে ঐ কাজগুলো যানবাহন চলাচল থাকলেও আমাদের কাজ চলবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, তাদের যদি জানা ই থাকে, তাহলে যে সব জায়গার কাজ শেষ হয়নি সে সব জায়গাগুলোতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে টহলে রাখা হলো না কেন। সরকার এবং রেল কর্তৃপক্ষ ভালো করেই জানেন যে, সেতুটি এখন চক্রান্তকারীদের নজরে। তারা যেখানেই সুযোগ পাবে, একটা কিছু ঘটাতে মারিয়া হয়ে কাজ করবে। সুতরাং সেতুটি নিরাপদ রাখার স্বার্থে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বদা সতর্ক অবস্থায় রাখতে হবে। সেতুতে চলাচলে জনসাধারণের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলে, এর দায়ভার সরকারের উপরই পরবে। অতএব সময় থাকতে সাবধান হতে হবে।

লেখকঃ দেওয়ান রফিকুল হায়দার (দেওয়ান ফয়সল), লেখক, সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিষ্ট, কমিউনিটি সংঘটক, সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব