

আমার কবিতার শরীর ও ভাবনা 🖋️
কবি বিদ্যুৎ ভৌমিক
প্রথম দিকে সারে সাত কী আট বছর অর্থাৎ শৈশবে নিজে নিজেই স্লেট পেন্সিল নিয়ে টুকরো টুকরো ছড়া কাটতাম ৷ ওই সময় সত্যজিৎ রায় সম্পাদিত সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশ পায় আট লাইনের একটা ছড়া ৷ এই অভ্যাসটা ছাপান্ন বছরে এসেও মনের দরজা খুলে বেরিয়ে যায় নি ! সিরিয়াস লেখার সূচনা বলতে তের কী চোদ্দ বছরের সন্দিক্ষণে , তাও আবার প্রেমের কবিতা ! সেই লেখা গুলোর খোলস উন্মোচন করার দুঃসাহস আমার হয়নি সেই সময়।
বাড়িটা আমাদের ভীষণ কনজারভেটিভ ! পড়ালেখা শিকে তুলে দিয়ে চিলে কোঠার ঘরে দুপুরে এক পা ভাঙা চৌকিতে বসে কবিতার বঙ্গলিপি খাতায় নীরবে নিভৃতে কবিতা লেখা ; এক কথায় কবিতার সাথে সহবাস ! সেই লেখা গুলো ঠিক নির্মাণ – বিনির্মাণ হতো কিনা সেটা ওই বয়ঃসন্ধিতে অনুধাবন করতে পারতাম না , একটা আমোঘ নেশা প্রতিদিন কবিতার শরীর নির্মাণে আমাকে ভীষণ ভাবে চালিত করতো।
লেখা পড়ায় আগ্রহ না থাকলেও কবিতার প্রতি আমার আকর্ষণ ওই বয়সের বিদ্যুৎ কে অহর্নিশ মনোযোগী করে তুলে ছিল ! সেই কারনেই বাড়ির বড়দের কাছে বকা , একমকি আমার বাবার হাতে বেত্রাঘাত খেতেও হয়েছিল ! আমাদের শ্রীরামপুর হুগনীর “কুসুমকুঞ্জ’- এর বাড়িতে প্রতি মাসে প্রথম শ্রেণীর কিছু ম্যাগাজিন আসতো টাসতো ৷ আমি ওই সব পত্রিকার ঠিকানা অঙ্কের খাতার পেছন পাতায় লিখে রাখতাম ৷ মাঝে মধ্যে ডাক মার্ফৎ দু’এক জায়গায় লেখাও পাঠিয়ে দিতাম ৷ দু’এক মাস অপেক্ষার পর সেই কবিতা বেমালুম ছেপে বেরুত ৷ সেটা প্রথম দেখতে পেলাম আমাদের বৈঠোকখানা ঘরের টেবিলে রাখা একটা ম্যাগাজিনের পাতা উল্টে পাল্টে দেখে ! এভাবেই কেটে যাচ্ছিল সময় , এভাবেই মন থেকে বেরিয়ে অন্য একটা রাস্তায় কবিতার শরীর অনুসন্ধানের দিকে হৃদয় চক্ষু মেলে দিয়ে নিজের আবেগকে দুর্বার গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম !
এবার আসছি কবিতায় উত্তর
আধুনিক নিয়ে কিছু কথা নিবেদন করতে ……
এই প্রসঙ্গ নিয়ে ইতিমধ্যে অনেকে অনেক ভাষণ-টাষণ দিয়েছেন ,নানা সাহিত্যধর্মী ম্যাগাজিনে লম্বা লম্বা প্রবন্ধ লিখেছেন পন্ডিত মহল ৷ আমি সেই বিচারে পণ্ডিত- টন্ডিত নই , তবে আমার সামান্য অল্পসল্প পড়াশোনা থেকে এটা বলতে পারি , আসলে আমার যেটা মনে হয় এই উত্তর আধুনিকতাবাদ আধুনিকতাবাদের একটা প্রকারন্ত দিক ! যা গোটা ব্যাপারটাকে সমৃদ্ধ করে । কিম্বা আধুনিকাতার পরবর্তী সিঁড়ি বলা যেতে পারে ৷ কিন্তু আসলে আদৌ সেটা তা নয় ! কারণ এরা পরস্পর বিরোধী পক্ষ৷
আধুনিকতার মূল উপজিব্য কারণ হল এটা যে সময় , একে আদ্যোপান্ত ধারণ করা ৷ কিন্তু উত্তরাধুনিকতার মূল বিষয়টা হল কোন কিছু ধ্রুব অর্থাৎ সত্য মেনে ধারণ করা যাবে না ৷ ফলে এই ধ্রুবহীনতাকে আদর্শ ধরে যে কাঠামোকে গ্রহণ করা হয় তাকেই বলা যেতে পারে উত্তরাধুনিকতাবাদ ৷ এই মতবাদটিতে লেখকের যে ক্যারেক্টরের কথা বলা হয়ে থাকে তা মূলত লেখকের স্বাধীনতা কিম্বা স্বকীয়তা। কবিতার বিষয়বস্তুই হল বাস্তবতার ভিন্নরূপ ! কেননা কবি তার চারপাশে যেই চিত্র উপলদ্ধি করেন তাই শব্দের মাধ্যমে আঁকেন ৷ তবে বাস্তবতাকে যদি ধ্রুব না মানা যায় তবে কি দরকার কবিতায় ধ্রুবহীনতা ?
এটাও কিন্তু সত্যি এই সব ব্যাপার ট্যাপার নিয়ে বেশি ভাবলে কিন্তু আসল দিকটায় ফাঁক থেকে যাবে। সেটা হল কবির কলম দিয়ে কবিতা নির্মাণ না হয়ে ব্যাকরণ ট্যাকরণ শব্দ ও অক্ষরে গড়ে উঠবে ৷ আমি বিশ্বাস করি কবিতা মূলত সমাজ ও শিল্প গঠনের উপর নির্ভর করে নির্মাণ হয় ৷ আবার এটাও সত্য কবিতা কিন্তু গঠন নির্ভর নয় ৷ কবিতা হল বিষয় আর ভাব নির্ভর ৷ বাস্তবতার কল্পনা জ্ঞান দ্বারা যে নির্মাণ কাজ সাধিত হয় সেটাই কবিতা ৷ আমরা কি আগের কোন কবির কবিতা ফেলে দিতে পারবো , কিম্বা তাঁদের সৃষ্টি নিয়ে বিদ্রুপ করতে পারি ? অবশ্যই নয় ৷ যেটা পারি তা কেবল কবিতার ভিন্নধারা নির্মাণ করতে ৷ এইজন্যেই কবিতা আধুনিক বা পুরাধুনিক হয় না ৷ আধুনিক কিম্বা পুরাধুনিক হয়ে যার কবিতার শব্দ , গঠন , ভাষা আর তার সময়ের প্রেক্ষাপট ৷ 🖋️
________________________
একটি কবিতা
________________________
আকাশলীনা তোর জন্য
বিদ্যুৎ ভৌমিক
যতোই আমায় বৃষ্টি বাদল স্বপ্নে এসে দেখা ; তোর মত মিথ্যা বলতে পারবো না ,—- তিন সত্যি ! দিব্বি কাটছি !
এই ভাবে ঠিক মনের মধ্যে প্রতি মূহুর্ত আঁকতে আঁকতে লাবণ্যরেখা ; এরপরেতে মেঘের দেহে হঠাৎ করে আচম্বিতে আগুন জ্বলে ওঠে , নতুন কেনা আয়না দিয়ে অঝর ধারায় শ্রাবণ নামে ছন্দ না মেনে ! ঠিক এভাবেই সে–ই আগের মতই দলবেঁধে বৃষ্টিরা সব একই সাথে নেমে আসে ভুবনডাঙায় ভরদুপুরে।
শেষ সন্ধ্যায় চাঁদের আলো কী ভাসমান অসাবধানী ; তবুও যেন ভালো লাগা , মন্দ লাগা যাইনি ভোলা !
দুই হাতেতে হঠাৎ পাওয়া বৃষ্টি আদোর ; হৃদয়পাড়ে যত্ন করে রাখাই ছিল সাতটা বছর ! এটা আমার সর্বকালিন সত্যি কথা ; তবুও আমি বুক বাজিয়ে বলতে পারি ,— তোর মত একটাও মিথ্যা বলতে পারবো না !
অন্ধকারকে বনের পথে খুঁজতে গিয়ে আকাশ আমায় হাত বারিয়ে দু চার মুঠো হীরের মতন জ্বল জ্বলে কত তারা !
এই যে আমার মনের মধ্যে সমুদ্র এসে সতত ঢেউ তোলে ; তবুও যেন তুমিশূন্য তুমিশূন্য এই বিছানা ,—- অবিবেচক প্রতিটা রাতে !
যদিও আমার স্বপ্ন থেকে নতুন একটা আকাশ ডাকে ; রূপকথারা সেই হরিণীর পেছন ছোটে মৃগনাভীর ব্যাকুলতায় !
হঠাৎ করেই অন্য একটা সময় এসে হাজির হলো ! এই তো আমার ঠোটের মধ্যে তোর আঁকা সেই প্রথম চুমু ; অটুট তবু স্মৃতিনির্জন ,—– তবু কেন এই এতক্ষণ তোরই জন্য অতল জুড়ে বৃষ্টি ভেজা সকাল – দুপুর – সারারাত্রি !
অন্য একটা দিনের মধ্যে সে–ই তোকে তাই গুছিয়ে রাখি ; স্বভাবদোষে !
বাতাসপরীর ডানার ঝাপট স্বপ্নে স্বপ্নে স্মৃতিনির্ভর ; অথচ কেন ভেতর থেকে ভুলতে চেয়েও যায়না ভোলা তোর দেওয়া সেই সর্তগুলো ! বহু দিনের কষ্টরা সব মিথ্যা মিথ্যা দগ্ধে মারে অতলান্ত ,—- শেষ পর্যন্ত এ’মন থেকে এতকালের বৃষ্টিগুলো বের করে দেই ; অথচ আমি অনেক চেষ্টায় না পারি যে তোকে ভুলতে , সত্যি বলছি আকাশলীনা !! তিন সত্যি , দিব্বি কাটলাম ……. !
স-মা-প্ত