

আফসানা আক্তার স্বামী-সন্তান নিয়ে থাকেন বরিশাল সদরে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগছেন। চলতি নভেম্বর মাসে তার ঢাকায় আসার কথা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধীদের ডাকা অবরোধ চলাকালে বিভিন্ন যানবাহনে আগুনের ঘটনার খবর শুনে তিনি আতঙ্কিত। এজন্য বাসে করে ঢাকায় আসার সাহস করছেন না তিনি।
আফসানা আক্তার বলছিলেন, বিভিন্ন বাসে আগুন দেওয়ার খবর শুনতেছি। নিমিষেই জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, টেলিভিশনের খবরে দেখছি। এসব দেখার পর বাসে উঠে যে ঢাকা যাব সে চিন্তা মাথায় আনতে পারছি না। যদি পথে কিছু ঘটে যায়!
শুধু বগুড়ার আফসানা আক্তার নন, তার মতো এখন বেশির ভাগ মানুষ আতঙ্কে রয়েছেন। জরুরি প্রয়োজনে বের হতেও দুশ্চিন্তায় ভোগেন- না জানি কখন কোন সহিংসতায় পড়ে যান। স্বজনরাও থাকেন উদ্বেগ-উৎণ্ঠায়। নাশকতার কারণে হরতাল-অবরোধে নগরের বাসিন্দারা খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকেও বের হন না।
২০১৩, ১৪ ও ১৫ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনেও এ ধরনের নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। সেই সময় অনেক নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। এ বছর ডেমরা এলাকায় ঘুমন্ত অবস্থায় আগুনে এক শ্রমিকের মৃত্যু ছাড়া এখনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে অনেক যানবাহন। আহত হয়েছেন অনেকে। এতে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে জনমনে।

বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর ডাকা গত কয়েক দিনের অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে সারাদেশে শতাধিক গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে অবরোধ কর্মসূচির আগের দিন বিকেল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পোড়ানো হচ্ছে যানবাহন। এতে পরিবহন মালিকরা বেশ উদ্বিগ্ন।
সারাদেশে বাস পোড়ানোর ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক দেখা দেওয়ায় বিভিন্ন রুটের ৮০ শতাংশ যাত্রী কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অবরোধে যে যাত্রী পান তাতে তেলের টাকাও উঠে না বলে জানান বাস মালিকরা। এজন্য ঘোষণা দিয়েও যাত্রী সংকটের কারণে তারা বাস যাতায়াত স্বাভাবিক রাখতে পারছেন না।
টাঙ্গাইল জেলা মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন বলেন, আগে সড়কে চলন্ত বাসে আগুন দেওয়া হতো। কিন্তু এখন কোথাও কোনো বাস দাঁড়িয়ে থাকলে সেটিতেও আগুন দেওয়া হচ্ছে। যা বড় অমানবিক।
বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনাগুলোর কারণে ৮০ শতাংশ যাত্রী কমে গেছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন রুটে যাত্রী কমে গেছে। যাত্রী থাকলে তো আমাদের গাড়ি চালাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু যাত্রী একেবারেই কম। দুর্বৃত্তরা দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িও পুড়িয়ে দিচ্ছে। তাহলে এই কাজ কি হরতাল বা অবরোধের আওতায় পড়ল? আসলে এটা হলো ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের সম্পদ নষ্ট করা। মূলত গোলযোগ সৃষ্টির জন্য এসব কর্মকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে। এক কথায় অবরোধের নামে এটা দুর্বৃত্তদের একপ্রকার শয়তানি।’
টাঙ্গাইল জেলা মিনি বাস মালিক সমিতির এই নেতার কথার সত্যতাও মিলল ঢাকা মহানগরীতে বাস চালানো কয়েকজন মালিকের সাথে কথা বলে। তারা জানালেন, গত ১০ দিনে অনেকে পথে বসে গেছেন। পরিবহন ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করবেন এই স্বপ্নে যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাস কিনেছিলেন, তাদের অনেকে চলতি মাসের ব্যাংক ঋণ কীভাবে পরিশোধ করবেন সেই চিন্তা করছেন। অবরোধ ডাকলেই এখন তাদের মনে আতঙ্ক দেখা দেয়। কখন জানি তার বাসটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এ কারণে অনেকে বাস না চালিয়ে গ্যারেজে ফেলে রাখছেন। যারা রাস্তাঘাটে বিভিন্ন খোলা জায়গায় বাস রাখছেন তাদের চিন্তা আরও বেশি বাড়ছে।
ঘাটারচর টু মিরপুর রুটে চলাচলকারী পরিস্থান পরিবহনের একটি বাসের মালিক বাবু। তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ থেকে বাস রাস্তায় নামাতে পারিনি। ভরসা পাচ্ছি না। কখন কী ঘটে যায়। শুধু আমি না, আমার মতোই ঢাকা শহরে কয়েকশ বাস মালিক এখন আতঙ্কে আছেন।

প্রজাপতি পরিবহনের হেলপার রুবেল বলেন, কয়েক দিন ধরে ভয়ে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছি না। বাস পুড়িয়ে দিলে মালিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সাথে আমরা পথে বসে যাব। এই ভয় থেকে অনেকে গাড়ি চালানো কমিয়ে দিয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের তথ্য মতে, গত ২৮ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত ১১৪টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে ৮৭টি ঘটনায় আগুন নেভাতে সক্ষম হয়েছেন তাদের কর্মীরা। অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিদের আগুনে পুড়ে যাওয়া যানবাহনের মধ্যে যাত্রীবাহী বাস ৫১টি, মিনি বাস তিনটি এবং মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, লেগুনা, পিকআপ ও মাইক্রোবাস নয়টি। ট্রাক পাঁচটি, মালবাহী কাভার্ডভ্যান চারটি, সিএনজি ও পুলিশের গাড়ি দুটি।
তবে যানবাহন পোড়ানোর ঘটনায় পরিবহন মালিক ও সংশ্লিষ্টদের সচেতন করছে পুলিশ। যানবাহনে আগুন দেওয়া ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা ট্রাফিকের ডিসি জয়নাল আবেদীন জানিয়েছেন, যারা সড়কে যানবাহন চলাচলে বাধা সৃষ্টি করবে তাদের সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করা হবে। এজন্য তিনি বাস মালিক, চালক, হেলপার এবং জনগণের সহযোগিতা চেয়েছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি এবং পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন যানবাহনে যারা আগুন দিচ্ছে তাদের হাতেনাতে ধরিয়ে দিলে ২০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। র্যাব-বিজিবি-আনসারসহ অন্যান্য বাহিনীও অবরোধে নাশকতা ঠেকাতে তৎপর রয়েছে।

সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও জনমনে আতঙ্ক কাটবে কি না সেটা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, জনমনে আতঙ্ক কাটাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কাজ করতে হবে। কোনো যানবাহনে যেন কেউ আগুন দেওয়ার সাহস না পায় সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে। তিনি বলেন, যে অবস্থা শুরু হয়েছে তাতে জনমনে আতঙ্ক তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছেন তাদের চিহ্নিত করে সাড়াশি অভিযান চালালে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক কমে আসবে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ মহিদ উদ্দিন বলেন, আমরা ঢাকা মহানগরবাসীর জন্য সর্বাত্মক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছি। সে কারণে অপরাধীরা এখন ছদ্মবেশে চোরাগোপ্তা হামলা করার চেষ্টা করছে। তারা বাস পোড়ানোর জন্য গান পাউডার ও পেট্রোল দিয়ে মানুষের সাথে অমানবিক এবং নির্মম আচরণটি করছে। এদের বেশ কিছুজনকে ধরা হয়েছে এবং বাকিদেরও ধরা হবে। এর বাইরে যারা আছে তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
সারাদেশে যানবাহন পোড়ানোর ঘটনায় পরিবহন মালিক শ্রমিকদের নানা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যারা পরিবহন খাতে কাজ করছেন তাদের আমরা অনুরোধ করব- চোখ কান খোলা রাখার জন্য। কেউ গাড়িতে উঠলে তার সাথে ব্যাগ থাকলে সেই ব্যাগে কী আছে তা খেয়াল রাখা। এসব বিষয়ে কাজে লাগবে তদন্তে। আজ হোক কাল হোক অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে।
নিউজ /এমএসএম