বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ০২:২৬ পূর্বাহ্ন

শব্দদূষণ রোধে দরকার দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ

মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ
  • খবর আপডেট সময় : শনিবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২৩
  • ২২৭ এই পর্যন্ত দেখেছেন

বাতাসের মাধ্যমে সহনক্ষমতার অধিক তীব্র বা তীক্ষ্ণ, বিশেষ করে সুরবর্জিত শব্দের উপস্থিতিতে মানুষ তথা জীবজগতের ওপর যে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি হয়, তাকেই শব্দদূষণ বলা হয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পের দ্রুত প্রসার, পরিবহনের অবাধ প্রবাহে প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এবারের থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনে ঢাকাজুড়ে আতশবাজি আর পটকা ফোটানোর গগনবিদারী মুহুর্মুহু শব্দে দিশেহারা ছিল জনগণ। ট্রেনের হুইসেলের ৯০ ডেসিবলের ঊর্ধ্বে শব্দ, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জেনারেটর, প্রচারের কাজে, সভায় বক্তৃতাকালে মাইক ব্যবহারেও শব্দদূষণ ঘটে।

বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি চালানোর শব্দ এলাকায় দূষণের সৃষ্টি করে। এ ধরনের শব্দের মাত্রা সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ ডেসিবল হয়ে থাকে। শিল্পকারখানার ব্যবহৃত সাইরেন থেকে ১৪০ ডেসিবল মাত্রার তীব্র শব্দ উত্থিত হয়। বিমান উড্ডয়ন এবং ওঠানামার সময় প্রায় ১১০ ডেসিবলের শব্দদূষণ ঘটে। সুরবর্জিত উচ্চ তীব্রতাসম্পন্ন শব্দ নারী, শিশুসহ রাস্তায় সার্বক্ষণিক কাজ করা মানুষ শব্দদূষণে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুরবর্জিত উচ্চমাত্রার শব্দের প্রভাবে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া, রক্তচাপ, শ্বাসক্রিয়া, দৃষ্টিশক্তি এমনকি মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপে অস্থায়ী বা স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

উচ্চমাত্রার শব্দদূষণে হৃৎস্পন্দন বৃদ্ধি পায়। হঠাৎ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্নায়ুতন্ত্রের সক্রিয়তা বেড়ে দেহের চলাচলে গতি-প্রকৃতির ক্রিয়া বিঘ্নিত হতে পারে। হৃৎপিণ্ডের ও মস্তিষ্কের কোষের ওপর অক্সিজেনের অভাবজনিত সমস্যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। একাগ্রতা হ্রাস পেয়ে হঠাৎ উত্তেজিত হওয়া এবং মাথা ধরার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। শব্দদূষণে মানবদেহের রক্তের শর্করার ওপর প্রভাব এবং রাত্রিকালীন দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পায়। এমনকি সুরবর্জিত উচ্চমাত্রার শব্দে মানসিক অবসাদ সৃষ্টি ও স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে পারে।

স্বাভাবিক জীবনে প্রতিদিন ঘরে, বাইরে সুরবর্জিত শব্দ মানুষের কানে ঢুকে দেহমনের যে ক্ষতি করে চলেছে, তা বেশিরভাগই টের পায় না। শব্দ যদি উচ্চমাত্রার হয় তাহলে সে ক্ষতি হবে অপূরণীয়। গ্লোবাল সিটিস ইনস্টিটিউশনের এমন সমীক্ষায় দেখা যায়, রাজধানীতে প্রতিনিয়ত যে ধরনের শব্দদূষণ ঘটছে তাতে বসবাসকারী মানুষের এক-চতুর্থাংশ কানে কম শোনে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ ৪৫ ভাগ মানুষ কানে কম শুনবে।

এ হিসাবে ২০৪৫ সালে দেড় কোটির বেশি মানুষ শব্দদূষণে আক্রান্ত হয়ে শ্রবণশক্তি হারাবে। সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনএপি) ‘বার্ষিক ফ্রন্টিয়ার্স রিপোর্ট-২০২২’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাকে শব্দদূষণে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহর নির্বাচিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবাসিক এলাকার জন্য অনুমোদনযোগ্য শব্দসীমার মাত্রা ৫৫ ডেসিবল।

এ ছাড়া বাণিজ্যিক এলাকা ও যেখানে যানজট রয়েছে সেখানে এই মাত্রা ৭০ ডেসিবল। ঘনবসতিপূর্ণ ও ব্যাপক যানজটের শহর ঢাকায় শব্দের মাত্রা পাওয়া যায় ১১৯ ডেসিবল। পরিবেশগত শব্দের উৎস হিসেবে রাস্তার যানজট, বিমান চলাচল, রেল চলাচল, যন্ত্রপাতি, শিল্প ও বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত রাস্তায় বিভিন্ন যানবাহন লোডারের বিকট হর্ন বাজিয়ে তীব্র বেগে ছুটে চলে। এ ধরনের শব্দ শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলেও উল্লেখ করা হয়। অন্য এক গবেষণা মতে, ঢাকার অনেক জায়গায় শব্দমাত্রা ১০৭ ডেসিবল পর্যন্ত ওঠে। ৬০ ডেসিবলের ঊর্ধ্বে শব্দ মানুষকে সাময়িক এবং ১০০ ডেসিবল ঊর্ধ্বে শব্দে মানুষ চিরতরে শ্রবণশক্তি হারাতে পারে।

বাংলাদেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, কোনো এলাকায়, দিনের কোনো সময়ে, কোনো ধরনের শব্দদূষণ করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। শব্দদূষণের জন্য দোষী হিসেবে কেউ প্রমাণিত হলে প্রথম অপরাধের জন্য এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা অথবা দুই ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে।

শব্দদূষণ রোধে প্রয়োজন ব্যক্তিগত, প্রযুক্তিগত এবং আইনগত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ। বাড়িঘরে বিনোদনের কাজে ব্যবহৃত রেডিও, টেলিভিশনের শব্দ যথাসম্ভব কমিয়ে শুনতে হবে। পেশাগত কাজে শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রপাতিতে শব্দ প্রতিরোধক যন্ত্র লাগিয়ে নিতে হবে। যানবাহন, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, কলকারখানা থেকে যে অনাকাঙ্ক্ষিত উচ্চশব্দ উত্থিত হয় তা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব।

শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি উন্নত প্রযুক্তি মানসম্পন্ন হলে তা থেকে শব্দদূষণ কম হবে। প্রতিরোধক ডিভাইস ব্যবহার শব্দদূষণ প্রতিরোধে ইতিবাচক ফল দেবে। স্থলপথের পরিবহন এবং বায়ুযানের চলাচলজনিত সামাজিক শব্দদূষণও প্রযুক্তিগত উপায়ে রোধ করা সম্ভব। সড়ক পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনে কম শব্দ বেরোয়, এমন ইঞ্জিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা জরুরি।

উৎসব, আয়োজনে মাইক বা লাউড স্পিকার বাজানোর জন্য শব্দসীমা নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক। বাড়িঘরে, স্কুল-কলেজে, হাট-বাজারের মতো জায়গায় নিচুস্বরে কথা বলার অভ্যাস করতে হবে। শব্দদূষণ রোধে জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং ব্যক্তিগত গাড়িচালক, বাসচালক, ট্রাকচালকদের সচেতনতা বৃদ্ধি শব্দদূষণ রোধে সহায়ক হতে পারে।

আগামীতে বর্ষবরণের মতো অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের ব্যাপারে এখনই উপায় খুঁজে বের করতে হবে। বিশেষ করে, পরিবেশ-প্রতিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে মনোযোগী হওয়া জরুরি। অতিরিক্ত উচ্ছ্বাসের বশবর্তী হয়ে শিশু-কিশোররা যাতে বেশি বাড়াবাড়ি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে সেদিকে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে। আতশবাজি বা পটকা ফোটানোর নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারেন।

বর্ষবরণের মতো কোনো আনন্দ উদযাপনের পথ বন্ধ করে দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই উন্মুক্ত কোনো স্থানকে বিশেষ জোন করে উৎসব পালনের জন্য নির্ধারণের কথা ভাবা যায়। দেশের শিল্পপতি, ব্যবসায়ীরা তাদের মালিকানাধীন শিল্পকারখানার শব্দ নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে পারেন। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে কম শব্দের লাউড স্পিকার ব্যবহার করে শব্দদূষণ কমিয়ে আনা যায়।

শব্দদূষণকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসতে গাড়ির হর্ন এবং মাইকের উচ্চশব্দ নীতিনির্ধারকরা সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। সর্বোপরি, এ ব্যাপারে দেশের নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ এবং প্রশাসনের সহযোগিতা শব্দদূষণ রোধে সহায়তা করবে। এ জন্য সরকারকে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102