

ঢাকা ও সিলেটে শ্রদ্ধার সাথে বরেণ্য অর্থনীতিবিদ, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী রাজনীতিবিদ, লেখক, ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিতের ৮৯ তম জন্মদিন পালিত হয়েছে।
জন্মদিন উপলক্ষে নানা কর্মসুচীর আয়োজন করা হয়েছে। সিলেটে সকালে এ এম এ মুহিতের কবরে সিলেটের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন ও ফাতেহা পাঠ করে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। 
বাদ জোহর সিলেটের দরগাহ হযরত শাহজালাল (রঃ) জামে মসজিদে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়।
এতে মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মাশুক উদ্দিন আহমদ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাকির হোসেন সহ আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ ও সকল সহযোগি সংগঠনের সর্বস্তরের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। 
দুপুরে সিলেটে বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. আল কবির সীমান্তিক কমপ্লেক্সে বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘সীমান্তিক’ এর উদ্যোগে আবুল মাল আবদুল মুহিত স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল আয়োজন করা হয়।
এছাড়াও সিলেটের বিভিন্নস্থানে এ এম এ মুহিত এর ৮৯ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা দোয়া মাহফিল আয়োজন করে বিভিন্ন সংগঠন।
এদিকে আবুল মাল আবদুল মুহিত স্মরণে ঢাকাতে পরিবারের পক্ষ থেকে নানা আয়োজনের পাশাপাশি বিকেলে ফরেন সার্ভিস একাডেমীতে চ্যানেল আই’র পক্ষ থেকে এ এম এ মুহিতের জীবন ও কর্ম নিয়ে নির্মিত ‘ত্রিকালদর্শী কর্মবীর’ প্রদর্শন ও স্মৃতিচারণের আয়োজন করা হয়। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এমপি সহ দেশের বরেণ্য ব্যাক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়াও বাদ মাগরিব নয়া পল্টনে সিলেট বিভাগ যোগাযোগ ও উন্নয়ন পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ে সিলেট বিভাগ যোগাযোগ ও উন্নয়ন পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় কর্মবীর সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য মরহুম আবুল মাল আব্দুল মুহিতের ৮৯তম জন্মদিন উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে ।
এ সকল কর্মসুচীতে বক্তারা মরহুম আবুল মাল আবদুল মুহিতকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের একজন সফল অগ্রনায়ক উল্লেখ করে বলেন, তিনি আমৃত্যু ছিলেন একজন কর্মবীর ব্যক্তি, যার চিন্তা চেতনায় সকল সময় ছিল দেশের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণ, যা তিনি তাঁর কর্মতৎপরতায় প্রমাণ করে গেছেন। তাঁর মতো একজন যোগ্য, খাঁটি দেশপ্রেমিক, স্পষ্টবাদী মানুষের এখন খুবই অভাব, এ এম মুহিত জীবনে যা বলতেন তাই করতেন, যা নিয়ে চিন্তা করতেন সেটা বাস্তবায়নে প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। বক্তারা তাঁর কর্মময় জীবনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে মহান আল্লাহর কাছে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। 
বক্তারা বলেন, অর্থনীতিবিদ, কূটনীতিক, ভাষা-সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা আবুল মাল আবদুল মুহিত অ্যাডভোকেট আবু আহমদ আব্দুল হাফিজের দ্বিতীয় পুত্র। তার মা সৈয়দ শাহার বানু চৌধুরীও রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।
মুহিত ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তিনি ১৯৫১ সালে সিলেট এমসি কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় প্রথম স্থান, ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে বিএ (অনার্স) পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম এবং ১৯৫৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ পাশ করেন। চাকরিরত অবস্থায় তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নসহ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএ ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস-এ (সিএসপি) যোগদানের পর মুহিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, কেন্দ্রীয় পাকিস্তান এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব্ পালন করেন। বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে তিনি পরিকল্পনা সচিব এবং ১৯৭৭ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বহিঃসম্পদ বিভাগে সচিব পদে নিযুক্ত হন।
মুহিত পাকিস্তান পরিকল্পনা কমিশনের চিফ ও উপ-সচিব থাকাকালে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের ওপর ১৯৬৬ সালে একটি প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে এটিই ছিল এই বিষয়ে প্রথম প্রতিবেদন। ওয়াশিংটন দূতাবাসের তিনি প্রথম কূটনীতিবিদ, যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ১৯৭১-এর জুন মাসে পাকিস্তানের পক্ষ পরিত্যাগ করে বাংলাদেশের পক্ষে আনুগত্য প্রদর্শন করেন।
১৯৮১ সালে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিয়ে তিনি অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও ইফাদে কাজ শুরু করেন। ১৯৮২-৮৩ সালে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর তিনি বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং ফেলো ছিলেন।
লেখক হিসেবে মুহিত সমান পারদর্শী। প্রশাসনিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গ্রন্থ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে তার ২১টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনে তিনি একজন পথিকৃত এবং বাপার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। মুহিতের স্ত্রী সৈয়দ সাবিয়া মুহিত একজন ডিজাইনার। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে প্রথম কন্যা সামিনা মুহিত ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞ, বড় ছেলে সাহেদ মুহিত বাস্তুকলাবিদ এবং কনিষ্ঠ পুত্র সামির মুহিত শিক্ষকতা করেন। আবুল মাল আবদুল মুহিত ২০০৯ অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
উল্লেখ্য যে, আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫শে জানুয়ারি বর্তমান সিলেট শহরের ধোপা দিঘির পাড়ে পৈতৃক বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন।
৩০ এপ্রিল ২০২২ শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৬ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। সিলেট নগরীর রায়নগরে মুহিত পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
নিউজ /এমএসএম