

৭১’-এর ১০ ডিসেম্বর সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে মাঘের তীব্র শীতের মধ্যে চোখ বেঁধে বাসা থেকে তুলে নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীরা হত্যা করে। গত ১০ ডিসেম্বর তার শাহাদত বার্ষিকী গেল।
আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো জাতি তার অতীতকে ভুলতে পারে না। অবহেলা করতে পারে না অতীতকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি দেশ। যে দেশকে তার স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে একটি দেশের বর্বর শাসক ও তাদের সৈন্যবাহিনীর হাতে ৩০ লাখ মানুষকে আত্মাহুতি এবং ৩ লাখ মা-বোনকে ইজ্জত বিসর্জন দিতে হয়েছে। কয়েক বছর আগে সেই বর্বর রাষ্ট্রের ডেপুটি হাই কমিশনার ঢাকায় বসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীনতা সম্পর্কে সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচার বির্সজন দিয়ে চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য পেশ করেছিলেন। অতি সম্প্রতি পাকিস্তানের সেনা প্রধান অবসর গ্রহণকালে বর্বর পাকবাহিনীর সাফাই গেয়ে বলেন, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কোন ভুল বা ত্রুটির কারণে পূর্ব পাকিস্থান হাত ছাড়া হয়নি। সেটা ছিল রাজনৈতিক নেতাদের অযোগ্যতা। পাকিস্তানী সেনা অফিসারদের মধ্যে এখনো ’৭১ পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার ব্যাপারে কোন অনুশোচনা বা বিবেকের দংশন অনুভব করে না। এই হচ্ছে পাকিস্তানীদের জাতীয় চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। আর তাদের এ দেশীয় দোসররা যখন স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সদা তৎপর তখন আমাদের অতীতকে আমাদের হৃদয়ে চির জাগরুক রাখার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে দেখা দেয়। পাকিস্তানি অপশাসন শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে ’৭১-এ যারা বাংলাদেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন তাদের মধ্যে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন একটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।
কাল পরিক্রমায় ১০ ডিসেম্বর ফিরে এসেছে। ’৭১-এর যুদ্ধের বিজয়ের সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র ৫ দিন আগে স্বাধীনতার শত্রু পাকবাহিনী ও তাদের জামাতি দোসররা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে গভীর রাতে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বাধীনতার উষালগ্নে তারা বহু বাঙালি বুদ্ধিজীবীকে একইভাবে হত্যা করে। পরাজয়ের মুহূর্তে পাকিস্তানিদের ও তাদের এদেশীয় দালালদের বুদ্ধিজীবী হত্যার এই ভয়াবহ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও তারা যেন দেশ চালাতে না পারে। তাদের সে চক্রান্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।
সাংবাদিক হিসেবে সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন আপোষহীন নির্ভীক সত্যনিষ্ঠ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। অপরদিকে অসহায় দুঃখী মানুষের জন্য তার ছিল অগাধ ভালোবাসা। মানুষের দুঃখ কষ্টে তিনি অস্থির হয়ে উঠতেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের যে কোনো প্রান্তর থেকে বহু হতদরিদ্র সাধারণ মানুষ তার কাছে আসত এবং তিনি তাদের অভাব অভিযোগের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। তারপর তিনি তাদের কথা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পত্রিকার পাতায় ছেপে দিতেন। দরিদ্র অবহেলিত মানুষ তার মধ্যে পেয়েছিল সত্যিকারের একজন বন্ধু এবং নিজেদের মানুষ। জনাব হোসেন স্বাধীনতা যুদ্ধের এক বছর আগে ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সৃষ্টি ও পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী অপশাসন, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রামাণ্য দলিলস্বরূপ ‘উধুং উবপরংরাব’ নামে একটি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থের ভূমিকায় আবুল মনসুর আহমদ লিখেছিলেন , His Presentation of facts and documents and their analysis have been quite correct and objective but not without subjective outpouring of patriotic heart and tormented soul representative of suffering millions.
একজন জনদরদী সাংবাদিক হিসেবে সিরাজুদ্দীন হোসেনের জীবনের লক্ষ্য ছিল এদেশের গণমানুষের অপশাসন ও শোষণের হাত থেকে মুক্তি এবং একটি সমৃদ্ধশালী উজ্জ্বল ভবিষ্যত অর্জন। তিনি তাঁর উধুং উবপরংরাব গ্রন্থের ভূমিকায় লেখেন, My greatest ambition in undertaking this task, however, is to focus the Point of view of the Common masses of our people, whose interest I sincerely believe, has been completely ignored by almost all the successive Governments and regimes that had been installed in power by constitutional or other means in the past. My success or achievement I will, therefore, recon in terms of my success in ventilating the wishes of the common people and supporting their hope for a better future.
অধ্যাপিকা হামিদা রহমান শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন সম্পর্কে লিখেছেন, “তিনি বিত্তশালী ছিলেন না। তবুও দেশের মানুষ তাকে ভালোবাসত। বাংলার মানুষের তিনি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা কুড়িয়েছিলেন। প্রাচুর্য কিংবা বিলাসিতার মধ্যে তিনি জীবন কাটাননি। তিনি জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়েছেন। দেশবাসীর দুঃখে তিনি হয়েছেন দুঃখী। জীবনের প্রারম্ভ থেকে জীবনের শেষ কটি মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বারংবার সংগ্রামের মুখোমুখী হয়েছেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন এক সরল সহজ প্রকৃতির মাটির মানুষ। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন উদাসীন। কিন্তু সাংবাদিক জীবনে তিনি ছিলেন এক অনলস শ্রমিক। বাংলার মানুষের দুঃখের রাতে, বাঙ্গালীর ঝড়ের রাতে তিনি ছিলেন সকলের চোখের মণি। তিনি ছিলেন বাঙ্গালীর অকৃত্রিম বন্ধু। বাংলার ঘরে ঘরে যখন নেমে আসতো প্রখর শীতালী রাত, তিনি তখন আগুনের ছোঁয়া দিতেন। তিনি তখন শীত তাড়ানোর অগ্নিদণ্ড নিয়ে হাজির হোতেন গ্রাম বাংলার প্রতি গৃহকোণে। বাঙ্গালীর দুঃখ দুর্দশা নিবারণের তিনি ছিলেন একটি অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।”
ব্যক্তিগত জীবনে তার অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা ছিল না। কিন্তু এতদসত্ত্বেও বহুজন-নিকট ও দূরের মানুষ আসত তাদের দুঃখ কষ্টের কথা নিয়ে। তিনি তাদের অসুবিধার প্রতিকারের চেষ্টা করতেন তার সকল সামর্থ্য দিয়ে। সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন মানুষের দুঃসময়ের বন্ধু। ব্যক্তিগতভাবেও পয়সাকড়ি দিয়ে অনেককেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন তিনি।
’৭১-এ যুদ্ধ চলছে। আমাদের একজন সাংবাদিক বন্ধু সমূহ বিপদের সম্মুখীন। তিনি মুক্তিবাহিনীর জন্য কাজ করতেন। খবরাখবর সংগ্রহের জন্য মাঝে মাঝে তিনি গোপনে ঢাকা আসেন। আর গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে চলে যান। তিনি যখন ঢাকা আসতেন, তখন তার পরিচিত দু’একটি জায়গায় যেতেন। একদিন তিনি তারই এক ঘনিষ্ঠ পত্রিকা অফিসে বসে কথা বলছেন এমন সময় সেই অফিসের টেলিফোন অপারেটর তাকে জানান যে, তার সেই অফিসে সেই সময়ে তার অবস্থান ক্যান্টনমেন্টে জানানো হয়েছে। কাজেই তিনি সমূহ বিপদের মুখে। একথা শোনা মাত্র তিনি ঐ অফিস থেকে বেরিয়ে পড়েন। ঐ দিন সারাদিন গা ঢাকা দিয়ে থেকে রাতের বেলা তিনি সিরাজুদ্দীন হোসেনের ৫নং চামেলীবাগের বাসায় গিয়ে তার বিপদের কথা জানান। তিনি আরো জানান ওই মুহূর্তে তিনি কপর্দকশূন্য এবং গাড়িভাড়া না থাকায় সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবেন না। যুদ্ধের মধ্যে সিরাজ সাহেব তার বড় সংসার নিয়ে নিজেই হিমসিম খাচ্ছেন এবং কায়ক্লেশে দিন কাটাচ্ছেন। তার হাত তখন একেবারে শূন্য। সিরাজ সাহেব তখন একটি চিরকূট লিখে তার এক ছেলেকে পাঠালেন এক প্রতিবেশীর বাড়িতে কয়েকটি টাকার জন্য। প্রতিবেশী ঐ ভদ্রলোক নিজের অসুবিধা সত্ত্বেও কিছু টাকা দিয়েছিলেন। সিরাজুদ্দীন হোসেন বিপদাপন্ন ওই সাংবাদিকের হাতে টাকা কয়টি তুলে দিয়ে ওই রাতেই সাবধানে ঢাকা ছাড়তে উপদেশ দেন। এ ধরনের বহু ঘটনা আছে শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের জীবনে। এভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধকালে বহু মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে সাহায্য করেছেন এবং গোপন তথ্য সীমান্তের ওপারে পাঠিয়েছেন।
শুধু ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়, এদেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জেহাদে তাঁর ভূমিকা ছিল অসাধারণ। ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় ইত্তেফাকের পাতায় দাঙ্গার বিরুদ্ধে যেভাবে তিনি কলম চালিয়েছিলেন তা সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে ছিল একটি মাইলফক। তিনি একদিন এই দাঙ্গার বিরুদ্ধে লিড নিউজের হেডিং দিয়ে ছিলেন ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও।’ সেই সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও প্রগতিশীল রাজনীতিকদের ভূমিকাও ছিল অনন্য সাধারণ। ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধকালে অবরুদ্ধ নগরীতে এণ্ড্রুক্লিসের উদ্যত খড়গের নিচে বসে অকুতোভয় সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেন যখন একের পর এক রাজনৈতিক নিবন্ধ লিখতে থাকেন তখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু হানাদার পাকবাহিনীর পৃষ্ঠপোষক জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’ সিরাজুদ্দীন হোসেনকে শত্রুরূপে চিহ্নিত করে লেখে : “এদেশের সরল প্রাণ ছাত্র-শ্রমিক-জনতা গত চব্বিশ বছর ধরে ঠগ সাংবাদিক ও রাজনীতিকদের পাল্লায় পড়ে ঠকে ঠকে অবশেষে চরম খেশারত দিয়ে এমন শেখাই শিখেছে যাতে নতুন কোনো ঠগ হাটি হাটি পা পা করে আবার তাদের ঠকাতে পা বাড়ালে কারোই দৃষ্টি এড়ায় না। তাই দেখছি কোনো এক ‘ঠগ সাংবাদিকের ঠকামীপূর্ণ ভাষ্য পড়ে এখানকার ছাত্র, শ্রমিক ও জনতার মাঝে গুঞ্জন চলেছে, ইজ্জত যায় না ধুইলে, খাসলাত যায় না মইলে। জনতা বুঝেছে, ঠগদের যুক্তিতেও ঠকামীর যাদু থাকে। তা দিয়েই তারা সকল জনতাকে বিভ্রান্ত করে নিজেদের মতলব হাসিল করে।”
ওই একই সময়ে ১৯৭১-এর ১৭ সেপ্টেম্বরের দৈনিক সংগ্রামে ‘শিরোনামের কারচুপি’ শীর্ষক নিবন্ধে নগ্ন ভাষায় জনাব সিরাজুদ্দীন হোসেনকে আক্রমণ করা হয় : ‘হাতে না পারলে ভাতে মারো’ বলে দেশে একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে। প্রবাদটির সাদা অর্থ হলো একদিক দিয়ে না পারলে অন্য দিক দেয়ে মারো, একদিকে সর্তক প্রহরা থাকলে, অন্য দিক দিয়ে সিঁদ কাটার চেষ্টা করো।… পেছনের দরজা দিয়ে দুরভিসন্ধি চরিতার্থের এ রীতি অতি পুরানো। সম্প্রতি আমাদের এক সহযোগী এ পুরনো রীতিকে নতুনভাবে রপ্ত করতে শুরু করেছেন দেখা যাচ্ছে। সহযোগীটি দেশের স্বার্থানুকূল সংবাদ পরিবেশন করতে বেশ অশ্বস্তি বোধ করে থাকেন। দেশের জনসাধারণের জন্য নিরুৎসাহজনক খবর পরিবেশন করার পক্ষে তার উৎসাহ যেন অপেক্ষাকৃত বেশি। কিন্তু সেন্সরশীপ এবং সেন্সরশীপের পর সুস্পষ্ট সামরিক নির্দেশের বাধা সামনে থাকায় সহযোগীটি স্পষ্টভাবে মুখ খুলতে পারছেন না। কিন্তু দুরভিসন্ধী চরিতার্থের প্রবণতাটিকে আবার আটকেও রাখতে পারছেন না। তাই নিরুপায় সহযোগীটি সংবাদ বিকৃত করার পথ পরিত্যাগ করে শিরোনামকে দুরভিসন্ধি চরিতার্থের এ পথ মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এমনভাবে সংবাদের শিরোনাম দেওয়ার কসরত করছেন যাতে করে তা দুরভিসন্ধি চরিতার্থের সহায়ক হয়। দুভিসন্ধি চরিতার্থের এ চাল অতি সূক্ষè-সিঁদ কাটার মতোই অতি সতর্ক ও অতি গোপন।”
আর এভাবেই গণহত্যায় লিপ্ত পাক হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় সহযোগী হিংস্র জামাতী পশুরা রাও ফরমান আলীর পরিকল্পিত বুদ্ধিজীবী হত্যার তালিকায় সিরাজুদ্দীন হোসেনের নামটি সংগোপনে অন্তর্ভুক্ত করে দেয়।
ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আশঙ্কাজনকভাবে ছেলে চুরি হতে থাকে। ইত্তেফাকের পাতায় সেসব সংবাদ ছাপা হতে থাকে। সংঘবদ্ধ শিশু অপহরণকারী দল এই ঘটনার পশ্চাতে সক্রিয় বলে অনেকেরই ধারণা।
কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পুলিশের আইজি এক প্রেস কনফারেন্সে মন্তব্য করলেন, শিশু অপহরণের এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সংঘবদ্ধ সুসংগঠিত দল এর পশ্চাতে নেই।
ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনের পুলিশের এই ধারণা মিথ্যা প্রমাণের জন্য বিষয়টি চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করলেন। তিনি প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য ময়মনসিংহে দু’জন রিপোর্টার ও ফটোগ্রাফার পাঠালেন। সিরাজুদ্দীন হোসেনের এবং ওই রিপোর্টারদের অক্লান্ত চেষ্টার ফলে উদ্ঘাটিত হলো রোমহর্ষক ঘটনা। ময়মনসিংহের গফরগাঁও, ত্রিশাল ও ভালুকা এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছিল গোচারণ ভূমি। ওই এলাকায় চাষাবাদ হতো না এবং লম্বা লম্বা ঘাস জন্মাত সেখানে। শিশু অপহরণকারীরা শিশু চুরি করে ওই স্থানে লুকিয়ে রাখত। তাদের নানারূপ অসামাজিক কাজে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তাদের ওপর চালানো হতো যৌন নির্যাতন। কচি শিশুদের কাউকে কাউকে হাতপা ভেঙে বিকলাঙ্গ করে ভিক্ষার কাজে লাগানো হতো। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ওইসব দুষ্কৃতকারীরা এসব অসামাজিক বর্বর কাজকর্ম এমন কৌশলের সঙ্গে করত যে তা ছিল যেমন বিস্ময়কর তেমনই ভয়াবহ।
সিরাজুদ্দীন হোসেন এবং তার রিপোর্টারদের অসমসাহসিক প্রচেষ্টায় পুরো ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়। এই কাহিনী রূপকথাকেও যেন হার মানায়। ইত্তেফাকের এই কাহিনী প্রকাশিত হওয়ার পর পুলিশও সক্রিয় হয়ে ওঠে। পুলিশের এই অভিযানে ৬৪টি বালক উদ্ধার পায় এবং বিপুল সংখ্যক দুর্বৃত্ত গ্রেফতার হয়।
সিরাজুদ্দীন হোসেনের এই সাফল্য দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউটের পত্রিকায় এই কাহিনী গুরুত্বের সঙ্গে বিশেষভাবে প্রকাশ করা হয়।
জনাব এবিএম মুসা বলেছেন, “বন্তুত সিরাজুদ্দীন হোসেনকে আমাদের দেশের ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং-এর জনক বলা যেতে পারে। ইত্তেফাকের ছেলেধরা সম্পর্কিত রিপোর্টের জন্য তাকে ম্যাগসেসে এওয়ার্ডের জন্য মনোনীত করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত শেষ পর্যন্ত তা দেওয়া হয়নি।”
জনাব সানাউল্লাহ নূরীর একটি লেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে গণমানুষের সেবায় নিবেদিত প্রাণ সিরাজুদ্দীন হোসেনের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। জনাব নূরী লিখেছেন, “বাংলাদেশের কোথায় কোন দূরের একটি অখ্যাত দ্বীপে ঘূর্ণিঝড় থাবা দিয়েছে। প্রলয়ের বাঁশী বাজিয়ে নেমেছে গোরকি। বিরান হয়েছে চরের পর চর। উজাড় হয়েছে অগণন জনপদ, সবুজ শ্যামল গ্রাম। শকুন পড়েছে লাশে। শেয়ালে খাচ্ছে মানুষের নুনে পোড়া শরীরের মাংস। যারা প্রাণে বেঁচেছিল, মরছে অনাহারে দুর্ভিক্ষে।
“কিন্তু তাতে তোমার কি সিরাজ? তুমি এমন পাগলের মতো পড়ে আছ কেন কাগজের টেবিলের সামনে? কেন এমন হয়রান হচ্ছো টেলিফোন নিয়ে?…বাংলাদেশের ক্লিষ্ট মানবতার যন্ত্রণার ছবি হুবহু তুলে ধরার জন্য কে বলেছে তোমায় সারারাত জেগে ছটফট করতে? তার জন্য কি তুমি নাওয়া খাওয়া বাদ দেবে সিরাজ? একটা রাত পার হয়ে আরেকটা সকাল আসার পরও কি বাড়ি যাওয়া হবে না তোমার? তোমার সংসার, ছেলে-বৌ নেই? সবাইকে ভাগিয়ে দেবে তুমি পরের দুঃখের খবরের পিছনে রাতদিন ছুটাছুটি করে?
“রাস্তায় মিছিল। গর্জাচ্ছে জনসমুদ্র। পায়ে পায়ে চলছে মানুষ। চলমান একটি নগরী। কাঁধে কাঁধে লাশ। রক্তমাখা নিশান হাতে। মুখে স্বাধীনতার শপথ।
“এ ছবি দেখে তুমি কাঁপছ কেন সিরাজ? অমন নিসপিস করছে কেন তোমার হাত? তোমার হাতে তো কোনো অস্ত্র নেই। আছে ছোট একটি কলম। ওই কলম দিয়ে কি তুমি কামানের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে? পারবে ঘাতকের হিংস্র ছোবলকে ভোতা করে দিতে?”
শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেনের লেখা ও অনুবাদ করা বহুসংখ্যক বইয়ের মধ্যে একটি হচ্ছে ‘ছোট থেকে বড়।’ এই বইয়ের জীবনীগুলো সেইসব মানুষদের যারা ছোট অবস্থা থেকে বিশ্ববিখ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর নিজের জীবনও যেন এই গ্রন্থের নেপথ্যে মিশে ছিল। পাঁচ বছর বয়সে পিতৃহারা হয়ে প্রচণ্ড সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তিনি নিজেকে যে অবস্থানে টেনে তুলেছিলেন তা ছোট থেকে বড় হওয়ারই এক সংগ্রামমুখর কাহিনী। ’৭১-এ ঘাতকদের হাতে তিনি যখন শহীদ হন তখন তার বয়স মাত্র ৪৩ বছর। স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশ সেবার বৃহত্তর ক্ষেত্রে তার সংগ্রামী জীবনের বিকাশের যে উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল ঘাতকের খড়গ তার ওপর যবনিকা টেনে দেয়। দেশ বঞ্চিত হয় এক সত্যনিষ্ঠ ত্যাগী ও মেধাবী মানুষের সেবা থেকে।
রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের একটি স্মৃতিচারণমূলক লেখার একটি অংশ উদ্ধৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমি এই লেখার সমাপ্তি টানব।
তিনি লিখেছেন: ‘আমার বাম হাতে বাঁধা ঘড়িটির দিকে যখন চোখ পড়ে, মাঝে মাঝে একটি ঘটনার কথা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। ১৯৫৪ সালের কথা। সিরাজুদ্দীন হোসেন তখন ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশন্সে সম্পাদনার দায়িত্বে নিয়োজিত। আমাকে একদিন ডেকে শিশুদের একটি ইংরেজি গ্রন্থ অনুবাদ করতে দিলেন। আমি কাজটি শেষ করে পাণ্ডুলিপি জমা দিলাম। মুদ্রিত হয়ে বইটি বের হলো। অনুবাদের জন্য আমি যে টাকা পেলাম তাই দিয়ে কিনলাম এই ঘড়িটি। আজও সেটি বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো আমাকে সাহায্য করে চলেছে। সিরাজুদ্দীন হোসেন অনেককেই নানাভাবে সাহায্য করেছেন। কিন্তু আমাদের দুঃখ, প্রতিদান দেওয়ার সুযোগ তিনি কাউকে দিলেন না। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের মাত্র পাঁচদিন আগে তিনি শহীদ হন। দেশকে ভালোবাসার চরম মূল্য দিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে প্রাণ দিলেন।
লেখক: কবি, সাহিত্যিক ও সম্পাদক, দৈনিক জনতা-০১৭১৪৬৬৮৩৩৫