মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬, ০২:২৬ পূর্বাহ্ন

তোফায়েল আহমেদ: বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি

হাসানাত কামাল
  • খবর আপডেট সময় : মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬
  • ২ এই পর্যন্ত দেখেছেন

বাংলাদেশর নামেরে সাথে তোফায়েল আহমেদের নামটিও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। রাজনৈতিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে যিনি অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু তাই কেবল একজন রাজনীতিকের বিদায় নয়। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তিও বটে।

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের সমাবেশ। সেদিন বাঙালির জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন তোফায়েল আহমেদ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি ছিল একটি ঐতিহসাকি মুহুর্ত, মাইলস্টোন।

কিছু মানুষ শুধু রাজনীতি করেন না, তারা একটি সময়ের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তেমনই একজন। স্বাধীনতার আগে ও পরে বাংলাদেশের যে দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, তার একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষীকে হারালো দেশ।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক উত্থান খুব অল্প বয়সেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকের শেষভাগে যখন পূর্ব পাকিস্তান উত্তাল, তখন তিনি ছিলেন আন্দোলনের সামনের সারির একজন তরুণ নেতা।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের কথা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরদিনই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছিলেন, যেখানে ছাত্রসমাজের বড় একটি অংশ তাঁর নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছিল।

স্বাধীনতার পর তোফায়েল আহমেদ গণপরিষদের সদস্য হন এবং ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে ওঠার সময় তিনি ছিলেন সেই প্রজন্মের অংশ, যারা নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিলেন।

পরবর্তীতে তিনি নয়বার জাতীঅয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিভিন্ন সময়ে মন্ত্রীসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ করে বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সময়কাল অনেকের কাছেই স্মরণীয়।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল সাফল্যের গল্প নয়। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে। দীর্ঘ সময় জেলেও কাটিয়েছেন। বাংলাদেশের বহু রাজনীতিকের মতো তিনিও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার উত্থান-পতনের নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন।

আজ যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রজন্ম ধীরে ধীরে ইতিহাসের অংশ হয়ে যাচ্ছে, তখন তোফায়েল আহমেদের মতো ব্যক্তিত্বদের জীবন নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। কারণ তাঁদের জীবনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি রাষ্ট্রের জন্ম, সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং বাস্তবতার গল্প।

তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকবে। কেউ তাঁর রাজনীতির প্রশংসা করবেন, কেউ সমালোচনা করবেন। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে তিনি যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন, তা অস্বীকার করা কঠিন।

তাঁর প্রজন্মের মানুষরা শুধু একটি স্বাধীন দেশ দেখেননি; সেই দেশ গঠনের লড়াইটাও করেছেন। আজ তাঁদের সংখ্যা দ্রুত কমে আসছে।

কিন্তু কিছু মানুষ চলে গেলেও তাঁদের সময়, তাঁদের সংগ্রাম এবং তাঁদের গল্প থেকে যায়। তোফায়েল আহমেদ সম্ভবত সেই কাতারেরই একজন।

লেখকঃ সাংবাদিক হাসানাত কামাল,  সম্পাদক আই নিউজ 

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102