

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ–বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত চেষ্টা, অজস্র ঘটনাধারা। এখানে রইল একাত্তরের প্রতিটি দিনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ।
অগ্নিঝরা একাত্তরের মার্চের প্রথম দিন দুপুর পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের জীবনযাত্রা ছিল মোটামুটি স্বাভাবিক। ৩ মার্চ থেকে ঢাকায় পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা। পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের নির্বাচিত এমএনএরা (মেম্বার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) ঢাকায় অবস্থান করছিলেন।
তবে বিগত দিনগুলোতে দেশ ছিল উত্তপ্ত। ডিসেম্বর ১৯৭০–এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের পরও পাকিস্তানের সামরিক শাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তর করতে নানা টালবাহানা করছিলেন। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে শুরু হয় সর্বাত্মক আন্দোলন। আন্দোলনের মুখে ইয়াহিয়া অবশেষে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।
আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় যোগ দেওয়ার জন্য নির্বাচিত সদস্যরা হোটেল পূর্বাণীতে সমবেত হয়েছিলেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাকিস্তান পিপলস পার্টি আর কাইয়ুম মুসলিম লীগ ছাড়া অন্য দলের নির্বাচিত সদস্যরাও ঢাকায় সমবেত হয়েছিলেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে পিপিপির যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মানুষের মনে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। এ ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিকই ছিল।
স্বাভাবিক এই পরিস্থিতি হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়ে পড়ল দুপুরে, রেডিওর এক আকস্মিক ঘোষণায়। বেলা ১টা ৫ মিনিটে ইয়াহিয়া ঘোষণা করলেন ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত থাকবে।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান তাঁর বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানের একটি প্রধান দল অর্থাৎ পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং অন্য কয়েকটি দল ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে না চাওয়ায় অধিবেশন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক মোকাবিলা একটি দুঃখজনক পরিস্থিতির সৃস্টি করেছে। এ ছাড়া ভারতের সৃষ্ট উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সার্বিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলেই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হবে।
ইয়াহিয়া খানের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়) ও কায়েদে আজম কলেজের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী কলেজ) ছাত্ররা লাঠি হাতে মিছিল বের করেন। আদমজী পাটকলের শ্রমিকেরা মিল বন্ধ করে নেমে এলেন রাস্তায়। বন্ধ হয়ে গেল অফিস–আদালত। শহরের দোকানপাট এবং তেজগাঁও বিমানবন্দরে বিমান চলাচল স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে গেল।
ঢাকাজুড়ে খণ্ড খণ্ড মিছিল এগোতে লাগল হোটেল পূর্বাণীর দিকে। বেলা তিনটার মধ্যেই পূর্বাণীর আশপাশ লোকে লোকারণ্য হয়ে গেল। সবাই অপেক্ষা করছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশের জন্য। হোটেল পূর্বাণীতে পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক শেষে বঙ্গবন্ধু একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। এর আগে তিনি জনতাকে ধৈর্য ধরতে বলেন। বলেন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে।
বঙ্গবন্ধু সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বাংলার মানুষ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইয়াহিয়ার এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সর্বাত্মক আন্দোলনের কর্মসূচি হিসেবে তিনি ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল আহ্বান করেন। একই সঙ্গে ৭ মার্চ রেসকোর্সে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভার ঘোষণা দেন।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগ ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে। রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক হল) ছাত্রলীগের সাবেক ও তৎকালীন নেতারা এক যৌথ সভায় বসেন। সভায় তাঁরা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা এবং জাতীয় সংগীতের কাঠামো ও রূপ নিয়ে কথা বলেন। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় পরদিন ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় ছাত্রলীগের সভায় ‘স্বাধীনতার প্রস্তাব’ পাঠ করা হবে। (সূত্র: বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ১৮৩০ থেকে ১৯৭১, ড. মোহাম্মদ হাননান)।
গভীর রাতে পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসক এক আদেশে সংবাদপত্রে দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো খবর বা ছবি প্রকাশ না করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, এ আইন ভাঙা হলে সামরিক আইনবিধি মোতাবেক সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
প্রত্যক্ষদর্শীর দৃষ্টিতে: শহীদজননী জাহানারা ইমাম তাঁর একাত্তরের দিনগুলি গ্রন্থে প্রত্যক্ষদর্শী ছেলে শাফি ইমাম রুমীর ভাষ্যে লিখেছেন: ‘একটার সময় স্টেডিয়ামে ছিলাম। …অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা যে–ই না কানে যাওয়া অমনি কী যে শোরগোল লেগে গেল চারদিকে। মাঠভর্তি চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার দর্শক সবাই “জয় বাংলা” স্লোগান দিতে দিতে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। ইউনিভার্সিটিতেও একই ঘটনা। রেডিওতে ঘোষণা শোনামাত্রই ছেলেরা সবাই দলে দলে ক্লাস থেকে, হল থেকে বেরিয়ে বটতলায় জড়ো হতে শুরু করেছে। …ছেলেরা পিলপিল করে আসছে চারদিক থেকে। মনে হলো সমুদ্রের একেকটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে বটতলায়। …ইয়াহিয়ার ঘোষণার এক ঘণ্টার মধ্যে পঞ্চাশ-ষাট হাজার লোক বাঁশের লাঠি আর লোহার রড ঘাড়ে নিয়ে পূর্বাণীর সামনে সবগুলো রাস্তা জ্যাম করে ফেলল। সে কী স্লোগান! পাকিস্তানি ফ্ল্যাগ আর জিন্নাহর ছবিও পুড়িয়েছে।’
স্বামী শরীফ ইমামের বরাত দিয়ে লিখেছেন: ‘পাশ দিয়ে আসার সময় দেখি হোটেলের সামনে তিনটা রাস্তাই একেবারে মেইন রোড পর্যন্ত লোকে ঠাসা। সবার হাতে লোহার রড আর বাঁশের লাঠি। …দৈনিক পাকিস্তানের (পরে দৈনিক বাংলা) দিক দিয়ে গাড়ি নিতে পারলাম না ভিড়ের চোটে। শেষে গভর্নর হাউসের (বর্তমান বঙ্গভবন) পাশের রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে গুলিস্তান ঘুরে এসেছি।’ (সন্ধানী প্রকাশনী, ১৯৮৬)
প্রত্যক্ষদর্শী সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন, ‘নিজেদের মধ্যে আলোচনার একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু হোটেলের বাইরে অপেক্ষমাণ বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতাকে উদ্দেশ করে বললেন, জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা এক সুদীর্ঘ ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি। একটি মাইনরিটি দলের (ভুট্টোর পিপিপি) একগুঁয়ে দাবির কারণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন মুলতবি ঘোষিত হয়েছে। তাই আমরা একে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দিতে পারি না।’ (দৈনিক পাকিস্তান, ২ মার্চ ১৯৭১)
প্রত্যক্ষদর্শী নুরুল ইসলাম নাহিদ (পরে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী) বলেন, রাজপথে মানুষের ঢল নেমেছে। প্রতিবাদী জনতা হাতে লাঠি ও অন্যান্য হাতিয়ার তুলে নিয়েছে…তখনই নেমে পড়লাম মিছিল নিয়ে। …রাজপথে এই প্রথম প্রকাশ্যে স্লোগান হলো ‘স্বাধীনতার’। এই প্রথম রাজপথে, প্রকাশ্যে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ স্বাধীনতার স্লোগান আপনা-আপনিই তুলে নিল। ‘ইয়াহিয়ার ঘোষণা, বাঙালিরা মানে না’, ‘পাকিস্তানের পতাকা, জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘জিন্না মিয়ার পাকিস্তান, আজিমপুরের গোরস্থান’ ইত্যাদি স্লোগান তুলে জনতা এগিয়ে যায়।’ (সূত্র: বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ১৮৩০ থেকে ১৯৭১, ড. মোহাম্মদ হাননান, পৃ. ৬০২)।