রবিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০৯:১৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের

প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন ও সাময়িক ভাবনা

দেওয়ান ফয়ছল
  • খবর আপডেট সময় : শুক্রবার, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৩
  • ১৮০ এই পর্যন্ত দেখেছেন

১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী প্রথমবারের মতো গঠিত হয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীনতম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গৌরব সাফল্যের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও গত ৪ঠা জানুয়ারী বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় পালিত হয় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ঐদিন অর্থাৎ ৪ঠা জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে বিরাট মঞ্চ তৈরী করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামী সাধারণ সম্পাদক জনাব ওবায়দুল কাদের। ওবায়দুল কাদের সাহেব তাঁর বক্তব্য শুরু করেন তার কিছুক্ষণের মধ্যেই মঞ্চটি অত্যধিক নেতার উপস্থিতির কারণে ভেঙ্গে পড়ে। অবশ্য এ ঘটনায় কেউ আহত হননি।

প্রায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ওবায়দুল কাদের সাহেব উঠে আবার তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, আমার এতো নেতার দরকার নেই, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে আমার কর্মীর দরকার। সত্য কথাটিই বলেছেন জনাব ওবায়দুল কাদের সাহেব। যুক্তরাজ্যোর মতো জায়গায়ও আমি বিভিন্ন সময়ে সুযোগ মতো আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের সভায় যাই, সেখানেও আমি দেখতে পাই মঞ্চের মধ্যে নেতাদের জায়গা হয়না, তাই নিয়ে অনেক সময় কথা কাটাকাটি থেকে শুরু করে হাতাহাতি পর্য্যন্ত হয়! এতো নেতার জন্ম শুধু আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগে নয়, অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোতেও একই অবস্থা।

রাজনৈতিক দলগুলোতে কিভাবে এতো নেতা তৈরী হয়, তা নিয়ে একটু আলোচনা করা দরকার বলে আমি মনে করি।
১৯৬৯ সাল থেকেই আমি ছাত্রলীগের একজন কর্মী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণীত হয়ে ছাত্রলীগের সাথে জড়িত হই। তখন আমি মৌলভী বাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে একজন ছাত্র। সে সময় থেকেই আমি দেখে আসছি, যারা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছিলেন তারা একদিকে যেমন ছিলেন একজন প্রকৃত ছাত্র এবং সেই সাথে ছিলেন মনে প্রাণে একজন ছালীগ কর্মী। শুধু নেতৃবৃন্দই নন, আমার মতো যারা ছাত্রলীগের সাধারণ কর্মী ছিলেন তারা ছিলেন একই রকম। অর্থাৎ তারা ছাত্র রাজনীতিকে জীবনের একটি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। এসব কর্মীরা নেতা হওয়ার চিন্তা ভাবনা তারা করেন নি, তারা চিন্তা করেছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে যাওয়া। সে সময়গুলোতে যারা ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন শহরে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ছিলো সততা, নিষ্ঠা এবং ছাত্রলীগকে একটি গৌরবময় সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। তাদের সেই কষ্ট এবং সততার ফসলই গত ৭৫ বছর যাবৎ বাংলার বুকে বহমান এই ছাত্রলীগ। তাদের হাতে গড়া ছাত্রলীগের সাধারণ সদস্যরাও তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠেছিলো ঠিক তাদের মতোই।

আজকের ছাত্রলীগের কার্য্যকলাপ যখন দেখি, সত্য কথা বলতে দ্বিধা নেই, ভেতরে ভেতরে যেন রক্তক্ষরণ হয়। বর্তমান যুগে রাজনীতি যারা করছেন সে রাজনীতি আদর্শের রাজনীতি নয়, তা হচ্ছে ’টাকার রাজনীতি’। তার সত্যতা আমি পেয়েছি, আমাদের বাংলাদেশ থাকা অনেক ছাত্রদের সাথে আলাপ করে। আমাদের রেষ্টুরেন্টে কাজ করতে আসা একজন ছাত্র কথা প্রসঙ্গে আমাকে বললো, এদেশে এসে ভুল করেছি, দেশে থাকলেই আমার জন্য ভালো ছিলো। ভালো টাকা রোজগার করতে পারতাম। বললাম, কিভাবে? বললো, আমি ছাত্রলীগ করতাম, আমাদের যে লিডার ছিলেন, তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। তিনি লক্ষ লক্ষ টাকার বিভিন্ন কাজের কন্ট্রাক্ট আনেন এবং সেই কাজগুলো আবার সাব-কন্ট্রাক্ট দিয়ে দেন, মাঝখানে তিনি লাখ লাখ টাকা লাভ করেন, এছাড়া যাকে সাব-করনট্রাক্ট দেন তার কাছ থেকেও পার্সেন্টেজ পান। উপরের মহলে উনার হাত আছে। এভাবে অনেকেই আমাকে বলেছেন।

এছাড়াও দেশে যখন আমার সাংবাদিক বন্ধুদের সাথে রাজনীতির বিষয় নিয়ে আলাপ করি তারাও আমাকে একই ধরণের কথা বলেন। তারা বলেন, ভাই আজকাল নেতা হওয়ার অর্থই হচ্ছে বছর খানেকের মধ্যেই লাখপতি হওয়া। এসব কথাগুলো শুনে আমার সাংবাদিক বন্ধুকে বললাম, তাহলে তো আমার মনে হয়, বর্তমানের রাজনীতি হচ্ছে আদর্শবিহীন রাজনীতি, শুধুমাত্র ’টাকার রাজনীতি’। তিনিও আমার কথা মেনে নিলেন। সুতরাং এ ভাবে যদি টাকার রাজনীতি চলতে থাকে তাহলে নেতাদের তো অভাব হওয়ার কথা নয়, তাদেরও অধিকার আছে স্টেজে ওঠে বসার, এরপর যদি তাদের উপস্থিতির কারণে স্টেজ ভেঙ্গে পড়ে তাহলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

এ ঘটনা শুধু ছাত্রলীগেই নয়, আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর বেলায়ও তাই। এ হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর সার্বিক অবস্থা।
বর্তমানে ’টাকার রাজনীতি’ থেকে সরিয়ে এনে নেতা কর্মীদের কিভাবে সত্যিকারের ’আদর্শের রাজনীতি’তে ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়ে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডকে গভীর ভাবে চিন্তা ভাবনা করে একটি পন্থা বের করতে হবে নতুবা ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের ভাবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। এখনও সময় আছে, দ্রুত পদক্ষেপ নিন।

গত ৮ই জানুয়ারী রোববার ইউ কে থেকে প্রচারিত ইউকে বিডি টিভি’তে ছাত্রলীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ছাত্রলীগের গৌরবের একাল-সেকাল: প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম শীরোনামে এক আন্তর্জাতিক ভার্চুয়ালী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইউকে বিডি টিভি’র চেয়ারম্যান, ইউকে ওয়েলস ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ মকিস মনসুরের সভাপতিত্বে এবং ইউ কে বিডি টিভি’র ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ইউকে ব্রিষ্টল বাথ এন্ড ওয়েষ্ট যুবলীগের সভাপতি ইন্জিনিয়ার খায়রুল আলম লিংকন এর উপস্থাপনায় অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি ৬০ এর দশকের ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সুলতান মাহমুদ শরীফ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সাবেক ছাত্রনেতা এম এ রহিম সি আই পি, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ছাত্র নেতা আব্দুল আহাদ চৌধুরী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মোস্তফা কামাল মিলন, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুল হাসিব মামুন, নিউইয়র্ক স্টেট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক ছাত্র নেতা শাহীন আজমল, মৌলভী বাজার জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিল্লুল আহমেদ, সাবেক ছাত্রনেতা হাজী আব্দুল বাছিত, নিউপোর্ট যুবলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সাবেক ছাত্রনেতা শাহ শাফি কাদির, মৌলভী বাজার জেলা ছাত্রলীগের সহ সভাপতি ফয়ছল মনসুর, ইউকে ওয়েলস ছাত্রলীগের সভাপতি বদরুল মনসুর, সাধারণ সম্পাদক শাজাহান তালুকদার শাওন, সাংগঠনিক সম্পাদক খায়রুল ইসলাম লিমন ও বিশিষ্ট সমাজ সেবক আহবাব হোসেন প্রমুখ।

ইউকে বিডি টিভি’র অনুষ্ঠান আমি পুরোটাই দেখেছি। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনাব সুলতান মাহমুদ শরীফ সহ সকল বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সময় বলতেন, ’ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস’। বাংলা, বাঙালী, স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের এসেম্বলি হলে তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণা ও পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম ছাত্র সংগঠন ’ছাত্রলীগ’। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ৭৫ বছরের ইতিহাস জাতির মুক্তির স্বপ্ন, সাধনা এবং সংগ্রামকে বাস্তবে রূপদানের ইতিহাস।

উক্ত অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মোস্তফা কামাল মিলনের বক্তব্যটি আমার কাছে খুবই মূল্যবান বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেছেন, আমাদের উচিৎ, ছাত্রলীগের আমাদের প্রবীণ যেসব নেতৃবৃন্দ রয়েছেন, তারা প্রত্যেকেই যদি সে সময়ে ছাত্রলীগ সংগঠনটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে যে ভাবে কাজ করে গেছেন সে সব তথ্য সম্বলিত বই প্রকাশ করেন তাহলে বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রলীগ কর্মীরা তাদের দায়িত্ব সম্বন্ধে অবহিত হতে পারবে। যার ফলে তারা তাদের ভুল সংশোধন করে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে রাজপথে অগ্রণী ভুমিকা রাখবে এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ও দিক নির্দেশনায় কাজ করে গেলে বাংলাদেশের সুনাম অক্ষন্ন রাখতে সক্ষম হবে।

লেখকঃ দেওয়ান রফিকুল হায়দার (ফয়ছল), কলামিষ্ট, সিনিয়র সাংবাদিক ও সদস্য লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব

দয়া করে খবরটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

এই ক্যাটাগরিতে আরো যেসব খবর রয়েছে
All rights reserved © UKBDTV.COM
       
themesba-lates1749691102