

ফসলে ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার ও জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ফরিদপুর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। একসময় পাখির কলকাকলিতে গ্রাম-বাংলার মানুষের ঘুম ভাঙত। তবে এখন আর আগের মতো সেই পাখির ডাক শোনা যায় না।
এ জেলা থেকে হারাতে বসা সুপরিচিত এসব পাখির মধ্যে রয়েছে ঘুঘু, বাবুই, টুনটুনি, কাঠঠোকরা, ফ্যাসকো, কোকিল, ডাঁহুক, মাছরাঙা, বউ কথা কও, সরালি, রাতকানা, সাদা বক, কানাবক, লালবক, জ্যাঠাবক, জলকুকু, ঠোঁটভাঙা, ধূসর কোয়েল, তোতাপাখি, ধলাঘুঘু, সুইচোর, পানকৌঁড়ি, সাতভায়রা, ডুবডুবি, গাংচিল, চাকলা, দোলকমল, প্যাঁচা, বালিহাঁস, বড় হাড়গিলা, রাজ শকুনসহ আরও অনেক নাম না জানা পাখি।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ফরিদপুর জেলার বড় অংশের জমিতে আগাছানাশক, কীটনাশক ও জমিশোধক রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তাছাড়া চোরাপথে আসা ভারতীয় উচ্চ দূষণীয় কীটনাশক অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে জলবায়ুর পরিবর্তন ও পাখিদের অভয়ারণ্য এ লোকালয় গড়ে না ওঠার কারণে নাম না জানা পাখিদের বংশ বিস্তার ঘটছে না।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ৬৫ বছর বয়সি প্রবীণ কৃষক আয়নাল মৃধা বলেন, ‘আমরা আগে জমিতে কীটনাশক দিতাম না। ফলে সে সময় মাঠেঘাঠে হরেক রকম পাখি নেচে বেড়াত। ফসলি মাঠে পাখির অবাধ বিচরণের ফলে অতিষ্ঠ হয়ে মাঠে পাহারায় বসতে হতো, আবার কখনো নির্দিষ্ট সময়ের আগেই ফসল ঘরে তুলতে হতো। আজ আর সেসব পাখি দেখা যায় না, পাখির ডাক শোনাও যায় না।

এ ব্যাপারে কথা হয় ফরিদপুরে কর্মরত আনোয়ার জাহিদ ও মো. সেলিম মোল্যা নামের দুইজন সংবাদকর্মীর সাথে। তারা বলেন, একসময় পাখির কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙতো এ অঞ্চলের মানুষের। দিনদিন পাখির সংখ্যা কমতে থাকায় তেমনটা আর চোখে পড়ে না। তাইতো, বাড়ির পাশে বাঁশঝাড়, বেত-ঝাঁড়সহ পাখিদের বাসযোগ্য গাছপালা রোপণ করার দিকে নজর দিতে হবে।
তারা আরও বলেন, এ জেলার মানুষ দিনদিন জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়িয়েছে; যার ফলে ফসলের মাঠে পাখিদের খাবার পোকামাকড়ের বংশবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে। তাইতো, জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈবসারের ব্যবহার বাড়ালে একইসাথে জমিতে ভালো ফসল উৎপাদন হবে। পাখিদের খাবার কীটপতঙ্গও জন্মাবে, যা খেয়ে পাখিরা বাঁচতে পারবে। ফলে পাখিদের বংশবৃদ্ধি বাড়বে।
জেলার কয়েকজন পাখি বিশেষজ্ঞ জানান, পাখিদের বংশবৃদ্ধি বাড়াতে গাছে কলস বা হাঁড়ি বেঁধে দেয়ার কাজ করা যেতে পারে। যাতে পাখিরা নিরাপদে ডিম ও বাচ্চা ফোটাতে পারে। এছাড়া পাখিদের অবাধ বিচরণ বাড়ানোর জন্য কৃত্রিম অভয়ারণ্য সৃষ্টির সাথে পাখির জন্য গাছে গাছে বাসা বেঁধে দেয়া যেতে পারে।
এ ব্যাপারে কথা হয় জেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম আসজাদের সাথে। তিনি বলেন, অব্যাহত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে প্রাণিদেহে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এসবের প্রতিক্রিয়ায় পাখিকূল বিলুপ্ত হচ্ছে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তো রয়েছেই।
এ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরও বলেন, পাখিদের বিচরণের জায়গা বাড়াতে হবে। পাখিদের বাসযোগ্য বনজঙ্গলসহ বিভিন্ন গাছপালার অভয়ারণ্য বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। এছাড়া পাখিদের শিকার করা থেকে বিরত রাখতে স্থানীয় সচেতনব্যাক্তিসহ প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি রাখা উচিত। অন্যদিকে জমিতে অব্যাহত রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈবসারের ব্যবহার বাড়ালে জমিতে ফড়িং, পোকামাকড় বাড়বে আর এগুলো খেয়ে পাখিরা বাঁচতে পারবে।
নিউজ /এমএসএম