দালাল ছাড়া কোন কাজ হবে না । দালাল থাকলে যে কোন অসাধ্য কাজ সাধ্য হয়ে যাবে । দালালদের এই দৌড়াত্ব ও ঘুষ-দুর্নীতির সীমাহীন অত্যাচারে অতিষ্ট সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে আসা ভুক্তভোগীরা । আছে কর্তা, কর্মচারী ও দালাল সিন্ডিকেট । এই সিন্ডিকেট পারেনা এমন কোন কাজ নেই । টাকা দিলে সব হয় । একজনের জমি লিখে দেয়া হয় অন্যজনের নামে ।
কাগজপত্র ঠিক আছে তাতে কি, কোন কাজ হবেনা । দলিল প্রতি দিতে হবে নির্দ্রিষ্ট পরিমান টাকা । দাবিকৃত অর্থ না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে দিনের পর দিন ঘুরানো হচ্ছে ভূমি মালিকদের, এমন অভিযোগ ভূক্তভাগীদের । দীর্ঘদিন ধরে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে চলছে এমন অনাচার । ৩০/৩১ ধারা রায় পরিবর্তনসহ নানা অনিয়ম ঘটছে হরদম । জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান, সদর সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার হুমায়ুন কবির, সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার রহিম উল্লাহ, উপ সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার গোলাম মোস্তফা লিটন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী আব্দুল মান্নান এবং ভারপ্রাপ্ত রেকর্ড কিপার আবুল খায়ের গংদের নেতৃত্বেই চলছে এই সিন্ডিকেট । সিন্ডিকেটের আছে নিজস্ব দালাল বাহিনী । যারা শিকার ধরে আনে আর মিলে মিশে চলে ভাগভাটোয়ারা ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেটেলমেন্ট অফিসের দালালদের মাধ্যমে অবৈধ টাকা লেনদেন করে থাকেন কর্মকর্তারা । এই দালালদের মধ্যে আবার ক্যাশিয়ারও আছে । কখনও দলিল প্রতি আবার কখনও শতক প্রতি চুক্তিতে টাকা দিতে হয় তাদের । সেটেলমেন্ট অফিসে আসা এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার নামে ১১ শতক বসতবাড়ীর জায়গা রয়েছে । সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও ছয় হাজার টাকা দাবি করা হয় তার কাছে । টাকা দিত না পারায় তাকে দিনের পর দিন ঘুরানা হচ্ছে । অপর একজন ভূমি মালিক জানান, তার পৈত্রিক সুত্রে পাওয়া বসতবাড়ীর সব কাগজপত্র ঠিক থাকার পরও ১০ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছে । তিনি কিছু টাকা কম দিতে চাইলে তার ফাইল গায়েব করা হবে বলেও হুমকি দেয়া হয় ।
সিলেটের বিএস জরিপ শেষ । এখন বণ্টন করা হচ্ছে প্রিন্ট পর্চা । চলছে সিলেট সিটি, সদরসহ কয়েকটি উপজেলার প্রিন্ট পর্চার প্রিন্টিংয়ের কাজ । কিন্তু এরইমধ্যে ধরা পড়েছে বড় ধরনের ঘাপলা । দেখা যাচ্ছে, অনেক ভূমির মালিকের অজান্তেই টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন করা হচ্ছে । বাংলাদেশের কোথাও সেটেলমেন্ট জোনে প্রেস নেই । কেবলমাত্র সিলেট জোনে প্রেস রয়েছে । আর এতে করেই দুর্নীতির পথ সহজ হয়ে গেছে । সিলেটে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসারের চাকরির বয়স দেড় বছর হলেও হুমায়ূন কবির ১৫ বছর, রহিমউল্লাহ ১৩ বছর, গোলাম মোস্তফা লিটন ১৬ বছর, আব্দুল মান্নান ২৬ বছর, আবুল খায়ের ১৫ বছর ধরে জোনাল অফিসে চাকরি করছেন । দীর্ঘসময় ধরে চাকরি করার সুবাদে তাদের শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে । তাদের ক্ষমতার কাছে অসহায় ভূমি মালিকরা ।
তাদের বিরুদ্ধে ভূমি মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি দপ্তরে অভিযোগ করেও কোনো কাজ হয়নি । মামলাও আছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে । শহরতলীর বড়শালা মৌজার পর্চা প্রিন্টিংয়ের জন্য জমা হয়েছে । এসএ রেকর্ডের টিলা শ্রেণি ভুয়া বিবিধ মামলা তৈরি করে শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়েছে । একজনের নামের ৮ একর ভূমি অন্যের নামে দিয়ে দেয়া হয়েছে । ওই মৌজার প্রেসের প্রূভ কপি পরীক্ষার জন্য সহকারী জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার ধ্রুব রঞ্জন দেব ও সার্ভেয়ার আহমদ শরীফকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল । পরে তাদের তদন্তে ৮ একর ভূমির বিষয়টি ধরা পড়ার পর শুধরানোর তাগিদ দেয়া হয় । এতে ক্ষুব্ধ হন জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মো. ওবায়দুর রহমান । নিজের ক্ষমতা বলে তিনি সার্ভেয়ার আহমদ শরীফকে দোয়ারাবাজার ও ধ্রুবরঞ্জন দেবকে টাঙ্গাইলে বদলি করে দেন ।
খতিয়ান টেম্পারিং তাদের উল্লেখযোগ্য একটি বাণিজ্য । বাইরের দালালদের মাধ্যমে চুক্তি করে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে খতিয়ান টেম্পারিং করা হয় । সেটেলমেন্ট অফিসার হুমায়ূন কবির দু’মাস আগে অবসরে গেছেন । কিন্তু এখনও অফিস করেন অঘোষিত । তিনি সিন্ডিকেটের সদস্য, টেম্পারিংসহ নানা কাজে পারদর্শী । তাই অফিসে তার কদর বেশি । প্রতিটি সেকশনে ছিল তার হাত । অবসরের পূর্ব পর্যন্ত তিনি একাধারে চূড়ান্ত প্রকাশনা, মুদ্রণ শাখা, ভলিয়ম বাধাই, রেকর্ড হস্তান্তর শাখা ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেন । তার বিরুদ্ধে একটি মামলাও আছে । মামলাটি বর্তমানে দুদকের তদন্তাধীন রয়েছে । বিভাগীয় মামলায়ও শাস্তি ভোগ করেছেন । সাবেক ভূমি সচিব মকসুদুর রহমান পাটোয়ারী তাকে ২০০০ সালে রংপুর জোনে স্ট্যান্ড রিলিজ করেন । তার খুটির জোর এত বেশি যে সবকিছুই ম্যানেজ হয়ে যায় ।
জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ভারপ্রাপ্ত সহকারী আব্দুল মান্নান ২৬ বছর একই অফিসে চাকরি করার সুবাদে অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন । দুর্নীতির শেষ নেই রেকর্ড কিপার আবুল খায়েরের । তার মূল পদবি মুহরীর। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত রেকর্ড কিপারের দায়িত্ব পালন করছেন । এক সময় ভারপ্রাপ্ত পেশকার হিসেবে দিরাইয়ে ছিলেন । ওই সময় সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার ও আপত্তি অফিসার জাফর আহমদের স্বাক্ষর জাল করে দুই হাতে টাকা কামাই করেন । দুর্নীতির অভিযোগে বিভাগীয় মামলার নথি টাকার বিনিময়ে গায়েব করে ফেলেন ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার ওবায়দুর রহমান বলেন, টুকটাক অভিযোগ আছে তবে গুরুতর কোন অভিযোগ তিনি শুনেননি । অভিযোগের অনেকগুলোই সত্য নয় । তার আমলে সেটেলমেন্ট অফিসে উল্লেখযোগ্য কোন অনিয়ম বা দূর্নীতি সংগঠিত হয় নি । কোন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন ।
ইউকেবিডিটিভি/ বিডি / এমএসএম